সুনামগঞ্জে পাউবোর পাঁচ’শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে পিডির নেতৃত্বে হরিলুট

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:১৯ এএম

সুনামগঞ্জ হাওরের ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, জরুরি সহায়তা প্রকল্পে’ ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। খোদ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামসহ পাউবোর কয়েকজন কর্মকর্তা-ঠিকাদার প্রকল্পের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎপর তদন্তের পর শফিকুল ইসলাম ও আরও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের এক নির্বাহী প্রকৌশলী, দিরাই ও শাল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলীসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। পাউবোর মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাইছার আলম। তিনি প্রকল্পের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

পাঁচশ’ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প : 

সরকার ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে সুনামগঞ্জ হাওরের ফসল রক্ষায় পাঁচশ’ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, জরুরি সহায়তা প্রকল্প’-এর আওতায় স্থায়ী বাঁধ, রেগুলেটর বা সুইসগেইট, ডুবন্ত বাঁধের সিসি ব্লক সুরক্ষা এবং ফ্লাড ফিউজ নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত। হাওরের ১৯ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ২৫৬ কোটি টাকা।

পিডি শফিকুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর শুকনো মৌসুমে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে বিরূপ অনিয়ম ও দুর্নীতি শুরু হয়। সংবাদপত্রে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ৬ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্লক ঢালাই ও সাইট তদারকিতে গাফিলতি দেখা গেছে, মানহীন পাথর ব্যবহার ও বর্ষায় বাঁধের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকৌশলী-ঠিকাদারদের যোগসাজশে দুর্নীতি

তদন্তে দেখা গেছে, প্রকল্পে ৩৬টি কাজ বাস্তবের তুলনায় দ্বিগুণ বিল প্রদানের মাধ্যমে পিডি ও কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। সুনামগঞ্জের আজাদ হোসেন নামের ঠিকাদার ৪টি প্রকল্পে প্রায় ৮০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করছেন, যেখানে দরপত্র প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এই দুর্নীতির পুরো প্রক্রিয়া তদারকিতে ছিলেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক। প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ পাঠানো হয়েছে অন্য কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাবেও। বর্তমানে সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন স্থানে গা ঢাকা দিয়েছে।

দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় পিডি শফিকুল ইসলামকে সিলেট থেকে ড্যাম ও ব্যারেজ শাখায় বদলি করা হয়েছে। তার স্থলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাইছার আলম পিডির দায়িত্ব নিয়েছেন। এছাড়া দিরাই ও শাল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলীসহ পাঁচ কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলি হয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগে সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম ও সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে চাকরিচ্যুতিও হতে পারে।

প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা

প্রকল্পের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের চার মাসের মধ্যেই ভেঙে গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের বৈশাখী বাঁধের উপরে ও দু’প্রান্তে ব্লক বসানো হয়নি, শুধু কালনী নদীর তীরে মানহীন ব্লক বসানো হয়েছে। উপরিভাগে ও হাওরের অংশে কাজ না থাকায় বর্ষা বা ঢেউয়ের সময় ফসল ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

পাওর-১ বিভাগে ৯.৪৫ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও ৮টি ফ্লাড ফিউজ নির্মাণে ১২১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পাওর-২ বিভাগে ৮.৯৬ কিলোমিটার বাঁধ ও ৭টি ফ্লাড ফিউজ নির্মাণে ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

Link copied!