নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর রেলপথে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলোতে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের গড়িমসি প্রশ্ন তুলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনার বাইরে বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই—ফলে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়া ক্রসিংগুলো আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে থানা (জিআরপি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ট্রেনে কাটা পড়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অথচ এর আগের বছরগুলোতেও একই রেলপথে ধারাবাহিকভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে—২০২৩ সালে ২৪ জন, ২০২২ সালে দারোয়ানী লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে চার ইপিজেড কর্মী এবং ২০২১ সালে মনশাপাড়ায় একই পরিবারের তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়।
রেলওয়ে বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দপুর থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত মোট ৩৬টি অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং থাকলেও মাত্র ১৩টিতে গেটম্যান রয়েছে। বাকি ২৩টি ক্রসিং কার্যত অরক্ষিত, যেখানে নেই স্বয়ংক্রিয় গেট, পর্যাপ্ত আলো কিংবা আধুনিক শব্দ সংকেত ব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। স্থানীয় বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ থাকায় এসব ক্রসিং দিয়ে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক বেশি।
এদিকে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নিয়ম অনুযায়ী অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা রুজু করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার কাঠামোগত দায় নির্ধারণ বা নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করে কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নের নজির নেই। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি দুর্ঘটনার কারণ বারবার একই হয়, তাহলে সমাধান কেন আসছে না? এতে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও শঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।
দারোয়ানী বাজার এলাকার বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, “আমরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হই। দুর্ঘটনা ঘটলে সবাই আসে, কথা বলে চলে যায়। কিন্তু গেটম্যান বা গেট বসানোর কোনো কাজ শুরু হয় না।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাতে আলো ও শব্দ সংকেত না থাকায় অনেক সময় ট্রেন আসার বিষয়টি বোঝাই যায় না, বিশেষ করে কুয়াশার সময়ে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ উন নবী বলেন, “দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। তবে লেভেল ক্রসিংয়ের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের আওতাধীন।”
রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা গেলেও কবে নাগাদ নতুন গেটম্যান নিয়োগ বা স্বয়ংক্রিয় গেট স্থাপনের কাজ শুরু হবে—সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি পাওয়া যায়নি। অপরদিকে, প্রশ্ন উঠছে—একের পর এক প্রাণহানির পরও কেন অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো সুরক্ষিত করা হচ্ছে না? গেটম্যান নিয়োগ ও নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়ন কোথায় আটকে আছে? দুর্ঘটনার দায় কেবল ‘ইউডি মামলা’তে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জবাবদিহি নিশ্চিত হবে?
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নীলফামারীর এই রেলপথে প্রাণহানির তালিকা আরও দীর্ঘ হবে। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ এই সতর্ক সংকেতকে গুরুত্ব দেয়—নাকি আরেকটি দুর্ঘটনার পর আবারও আলোচনা থেমে যাবে।
আপনার মতামত লিখুন :