পৌষসংক্রান্তিতে মৌলভীবাজারের শেরপুরের মাছের মেলা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি বাজার নয়—এটি একটি উৎসব, একটি ঐতিহ্য। কালের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য আজ অস্তিত্ব সংকটে। জায়গা সংকুলান, নদী ভরাট, দেশীয় মাছের সংকট, চাষের মাছের আধিক্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী এই আয়োজন।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই শতাব্দী আগে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের সাধুহাটি এলাকার জমিদার মথুর বাবু প্রথম এই মাছের মেলার আয়োজন করেন। তখন মনু নদ-তীরবর্তী মনুমুখ এলাকায় নৌপথেই যোগাযোগ ছিল সহজ। স্থানীয় হাওর ও নদীর বিশালাকৃতির দেশীয় মাছে ভরে উঠত মেলা। তবে মনু নদের ভাঙনে বাজারের আয়তন ছোট হয়ে গেলে মেলাটি স্থানান্তর করা হয় সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায়। গত অর্ধশতাধিক বছর ধরে এখানেই নিয়মিত বসছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলাটি।
প্রতি বছর পৌষসংক্রান্তির একদিন আগে এই মেলা বসে। মাছের পাশাপাশি আনাজ-তরকারি, কৃষিপণ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রীর দোকান থাকলেও ‘মাছের মেলা’ নামেই এর পরিচিতি।
মেলাটি ১৩ জানুয়ারি হওয়ার কথা থাকলেও এ বছরও ১২ জানুয়ারি রোববার একদিন আগে কুশিয়ারা নদীর তীরে শেরপুরে বসে মেলাটি। সারা রাত পাইকারি মাছ বিক্রি হয় এবং সোমবার দিনভর চলে খুচরা বিক্রি।
মৎস্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জানান, রোববার বিকেল থেকেই মেলায় ভিড় জমতে শুরু করে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে এবং মৌলভীবাজার–শেরপুর আঞ্চলিক সড়কের পশ্চিমের বেরি বিলসংলগ্ন মাঠে মেলাটি বসে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল হাওর এবং কুশিয়ারা নদী থেকে মাছ আসার কথা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে দেশীয় মাছের জায়গা দখল করে নিচ্ছে চাষের মাছ।
এবারও কিছু স্থানীয় মুক্ত জলাশয়ের মাছ মেলায় উঠেছে, তবে পরিমাণ কম এবং দাম বেশি। বড় আকারের মাছও খুব একটা দেখা যায়নি। ব্যবসায়ী নছির আহমদসহ কয়েকজন বিক্রেতা বড় বাঘাড়, বোয়াল ও আইড়জাতীয় মাছ এনেছেন। প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বাঘাড়ের দাম চাওয়া হয়েছে তিন লাখ টাকা। ১০–১৮ কেজি ওজনের বোয়ালের কেজি দাম ১ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা এবং ১১–১২ কেজি ওজনের আইড় মাছের কেজি দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ নিয়ে বিক্রেতারা মেলায় উপস্থিত হন। অনেক মানুষ কৌতূহলবশত মাছ দেখতে আসেন, কেউ কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী মাছ কিনে বাড়ি ফেরেন। রাত-দিন মিলিয়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাইকারি বিক্রির জন্য আফরোজগঞ্জ মৎস্য আড়তদার বহুমুখী সমবায় সমিতির ১৫টি আড়তের ১৭টি দোকান ছিল। শেরপুরের আফরোজগঞ্জ মৎস্য আড়তদার সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের পরিচালক রাজু আহমদ বলেন, “এবার লোকাল মাছ কম, দাম বেশি। জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে অনেকে লোকসান হলেও দোকান দেন। মেলাটি টিকিয়ে রাখতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।”
খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী বলেন, “ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় মেলা বসে। প্রতিবছর জায়গা কমছে। নির্দিষ্ট স্থায়ী জায়গা না থাকায় আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া যায় না।” তিনি বলেন, শেরপুর মাছের মেলা যদি পনের দিন আগে লিজ দেওয়া হতো, তাহলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতেন এবং সরকারের রাজস্ব অনেক বেশি আয় হতো।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব হোসেন জানান, “এবার প্রকাশ্য নিলামে ইজারা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্তত ১৫ দিন আগে টেন্ডার দেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, এ বছর মেলা ইজারা থেকে ১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
একসময় যে মাছের মেলা ছিল নদী ও হাওরকেন্দ্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি, আজ তা সংকুচিত বাস্তবতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে। শেরপুরের মাছের মেলা এখন শুধু কেনাবেচার স্থান নয়—এটি হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী।
আপনার মতামত লিখুন :