মনির হোসেন, কালিহাতী: টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে শওকত আলী খান কামাল (৭০) নামের এক বৃদ্ধের রক্তাক্ত লাশ গত ৫ নভেম্বর নিজ বাড়ির বাঁশঝাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। এই হত্যা মামলার রহস্য দীর্ঘদিনেও উদঘাটিত না হওয়া এবং ভিকটিমের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন নিহত শওকত আলী খান কামালের পুত্র ও মামলার বাদী নাহিদ খান, যিনি কালিহাতী উপজেলার পাছ চারান উত্তর পাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
জানা গেছে, গত ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার রাতে নিজ বাড়িতে রহস্যজনকভাবে খুন হন শওকত আলী খান কামাল। পরের দিন ৫ নভেম্বর দুপুরে চারান উত্তর পাড়া গ্রামের বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ের জঙ্গল থেকে তার আঘাতের চিহ্নসহ রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে কালিহাতী থানা পুলিশ।
স্থানীয়রা জানান, শওকত আলী খান কামাল পরিবারসহ রাজধানী ঢাকাতে বসবাস করতেন। খুন হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি কালিহাতী উপজেলার পাছ চারান উত্তর পাড়া গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন গৃহস্থালী ও আবাদী জায়গা জমি দেখাশোনা করার জন্য। ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার রাতে তিনি তার নিজ বসত ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন বসতবাড়ির পাশে একটি বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়।
৫ নভেম্বর বুধবার দুপুরে কালিহাতী থানা পুলিশ নিহত শওকত আলী খান কামালের (৭০) শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে টাঙ্গাইল সদর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেন। একইদিন টাঙ্গাইল সদর জেনারেল হাসপাতাল থেকে পোস্টমর্টেমের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিহতের পরিবারের সদস্যরা শওকত আলী খান কামালের মরদেহ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে দাফন সম্পন্ন করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালিহাতী থানার এসআই সুকান্ত রায়, মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন "প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিকতায় অণ্ডকোষে চাপ ও গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা"। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে শওকত আলী খান কামাল হত্যা রহস্য উদঘাটনে ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করেন।
গত ৫ নভেম্বর নিহত বৃদ্ধের পুত্র মোঃ নাহিদ খান (২৯) বাদী হয়ে কালিহাতী থানায় একটি এজাহার দাখিল করেন। এজাহার মূলে কালিহাতী থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়, যার নম্বর ৬ তারিখ ০৫/১১/২০২৫ ইং, ধারাঃ ৩০২/৩৪।
এই পিতৃহত্যা মামলার বাদী মোঃ নাহিদ খান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "আমার বাবা মোঃ শওকত আলী খান কামালকে গত ০৪/১১/২০২৫ ইং তারিখ আনুমানিক রাত ৯.৩০ ঘটিকার পরে নিজ বসত ভিটায় খুন করা হয়। মৃতদেহ ঘরের পিছনে বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে পড়ে ছিলো। পরের দিন ৫/১১/২০২৫ তারিখ আনুমানিক সকাল ৯.৫০ মিনিটে আমার চাচা লুৎফর রহমান খান আরিফ ফোন করে আমাদের জানায় আমার বাবাকে কে বা কারা হত্যা করে বাড়ীর পাশে বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে ফেলে রেখেছে।"
তিনি আরও বলেন, "তারপর ওইদিন রাতেই আমি বাদী হয়ে কালিহাতী থানায় একটি এজাহার দায়ের করি। কিছুদিন পর লোক মারফত জানতে পারি মোঃ সাজ্জাত হোসেন রুমেল ওরফে রুমেল হোসেন (২৭), পিতা- মৃত দুলাল মিয়া, সাং- ঝগড়মান উত্তর পাড়া, থানা কালিহাতী, জেলা- টাঙ্গাইল নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত আসামিকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এ ব্যাপারে কালিহাতী থানা থেকে কোনো কিছুই আমাকে জানানো হয় নাই। আমরা বারবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুকান্ত রায়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি আমাকে কোনো রকম গুরুত্ব দিচ্ছেন না, যা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বেদনাদায়কও বটে।"
নাহিদ খান বলেন, "আমার বাবা হত্যার মামলাটি ৩ মাসের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন অফিস থেকে অদ্যাবধি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেওয়া হয়নি, যা রহস্যজনক। আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি আমার বাবা হত্যার সাথে জড়িত একাধিক ব্যক্তি কালিহাতী থানা পুলিশ ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে হত্যা মামলাটির রহস্য ভিন্নখাতে প্রবাহের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন।"
স্থানীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নিহত শওকত আলী খান কামালের সাথে তাদের শরিক লুৎফর রহমান খান আরিফদের সাথে বাড়ির পাশের রাস্তার পরিমাপ নিয়ে সমস্যা ছিল এবং বাউন্ডারী দেওয়াল নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র হয়। আরেকটি অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে, লুৎফর রহমান খান আরিফের মেয়ের জামাই মোঃ সাজ্জাত হোসেন রুমেল ওরফে রুমেল হোসেন (২৭) ওই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার ধারণা করছেন এলাকার অনেকেই। লুৎফর রহমান খান আরিফদের সাথে নিহত শওকত আলী খান কামালের সাথে একাধিকবার সম্পত্তি নিয়ে প্রকাশ্য ঝগড়াঝাঁটি হওয়ার কথাও এলাকায় চাউর আছে। এমনকি নিহত শওকত আলী খান কামালকে কোনো এক সময় আরিফ তলপেটে লাথি দিয়ে গুরুতর আহতও করেছিলেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুকান্ত রায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মামলাটির তদন্তের কাজ করছে, ইতোমধ্যেই সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে, পোস্টমর্টেম রিপোর্টের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, রিপোর্টটি পেলেই আশা করছি দ্রুতই ওই মামলার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে।"
টাঙ্গাইল জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার ফরাজী মোঃ মাহবুবুল আলম মন্জু জানান, "পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তিনভাবে করা হয়, একটি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, একটি করে জেলা সদর হাসপাতাল এবং একটি করে ফরেনসিক বিভাগ ঢাকায়। এটি কোথায় আছে এই মুহূর্তে আমার জানা নাই, এই রিপোর্টটি কোথায় আছে আমাকে জানালে আমি সহযোগিতা করবো। তাছাড়া আমার এখানে কোনো রিপোর্ট এলে সাথে সাথেই সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে থাকি।"
আপনার মতামত লিখুন :