সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় তিন শতাব্দি প্রাচীন নবরত্ন মন্দির: এক ঐতিহাসিক নিদর্শন

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের হাটিকুমরুল নবরত্ন পাড়ায় অবস্থিত প্রায় তিন শতাব্দি প্রাচীন দোল মন্দির, যা স্থানীয়ভাবে ‘নবরত্ন মন্দির’ নামে অধিক পরিচিত, আজও অতীত ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম নবরত্ন শৈলীর মন্দিরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম এবং উল্লাপাড়া উপজেলার সবচেয়ে পরিচিত দর্শনীয় স্থান হিসেবে সমাদৃত। সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় এক কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়ে এই অনন্য স্থাপত্য।

তিন তলা বিশিষ্ট এ মন্দিরের প্রাঙ্গণে রয়েছে আরও দুটি ছোট মন্দির। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, সতেরো শতকে জমিদার বংশের উদ্যোগে মন্দিরটি নির্মিত হয়। তৎকালীন বাংলার মন্দির স্থাপত্যে নবরত্ন শৈলী ছিল বিশেষ জনপ্রিয়—যেখানে মূল কাঠামোর ওপর নয়টি শিখর স্থাপন করা হতো। এককালে মন্দিরের উপরে ছিল সুনিপুণ নকশায় নির্মিত নয়টি শিখর, যা ফুল, লতাপাতা, পৌরাণিক কাহিনি ও দেবদেবীর মূর্তি খচিত অলংকরণে সমৃদ্ধ ছিল। বর্তমানে মূল নয়টি শিখরের মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি অক্ষত রয়েছে; বাকি সাতটি সময়ের বিবর্তনে বিলীন হয়েছে। তবুও কার্নিশ, দেয়াল ও খিলানের অলংকরণে এখনও ফুটে ওঠে প্রাচীন শিল্পরুচির নিদর্শন।

মন্দিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫৬ বর্গফুট। পুরু ও মজবুত দেয়ালবিশিষ্ট এই স্থাপনাটি চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ইট দিয়ে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়দের মতে, প্রতিটি ইটই হাতে তৈরি। বাইরের দিকে ৪৩টি এবং ভেতরের দিকে ৯টি প্রবেশপথ থাকায় মন্দিরটির বায়ু চলাচল ও আলোকসজ্জা প্রাকৃতিকভাবেই নিশ্চিত ছিল—যা তৎকালীন স্থাপত্য জ্ঞানের পরিচায়ক।

মন্দিরটি ১৯৬৯-৭০ সালের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিবন্ধিত হয় এবং ১৯৮৭ সালে ‘সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান’ হিসেবে আংশিক সংস্কার করা হয়। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বাড়ানো হলে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিতি লাভ করবে।

শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ, প্রাচীন স্থাপত্যের নান্দনিকতা ও গ্রামীণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলিয়ে স্থানটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। ঈদ, দুর্গাপূজা ও বিভিন্ন ছুটির দিনে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে নবরত্ন মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং বাংলার প্রাচীন স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যা সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

Advertisement

Link copied!