কক্সবাজারের রামু উপজেলার হিমছড়ি পেঁচারদ্বীপ এলাকায় এক রিসোর্টকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটি রিসোর্টের কক্ষ থেকে মোবারক আলী নামে এক কর্মচারীর মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর ঘটনাটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এ নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে গভীর সন্দেহ ও উদ্বেগ।
জানা যায়, পেঁচারদ্বীপ এলাকার ওয়েভসিয়া বিচ রিসোর্টে সহকারী বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত ছিলেন মোবারক আলী। গত ২২ মার্চ সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে রিসোর্টের একটি কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করেছে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে ঘটনাটির শুরু থেকেই একের পর এক অসঙ্গতি সামনে আসতে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মরদেহ উদ্ধারের সময় মোবারকের নাক দিয়ে ফেনা এবং মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, যা স্বাভাবিক মৃত্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে, অভিযোগ উঠেছে মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, সকাল ৮টার দিকে মৃত্যু নিশ্চিত হলেও প্রায় দেড় ঘণ্টা পর, সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে মোবারকের মা ইয়াছমিন আক্তারকে ফোন দেন রিসোর্টের ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল মোবারক। মোবারকের মা ইয়াছমিনকে ফোন করে মোবারকের সঙ্গে একটি সমস্যা হয়েছে জানিয়ে দ্রুত রিসোর্টে আসতে বলা হয়, পরে আবার ফোন করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে যেতে বলা হয়। এভাবে কখনো হাসপাতালে আবার কখনো ওয়েভসিয়া রিসোর্টে আসতে বলে ম্যানেজার বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন, যা পরিবারকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও পরিবারকে অবহিত করার আগেই মরদেহে পানি ঢেলে সম্ভাব্য আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে ঘটনাটি আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে।
ঘটনা সম্পর্কে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম সোহেল জানান, আমাকে সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে বিষয়টি জানানো হয়। পরে জানতে পারি ঘটনাটি ৮টার আগেই ঘটেছে। এমন ঘটনার বিষয়টি নিয়ে নানান প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় গ্রাম পুলিশ সদস্য বেলাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার এলাকায় এত বড় একটি ঘটনা ঘটলেও আমাকে জানানো হয়নি। এতে মনে হচ্ছে ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব থাকার অভিযোগ। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ফুটেজ দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে দরজায় কেবল একটি বড় ছিদ্র রয়েছে, যা দিয়েই সহজে দরজা খোলা সম্ভব ছিল। এতে তাদের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া স্থানীয়দের পক্ষ থেকে রিসোর্টে অবৈধ মদ সংরক্ষণ ও নিয়মিত মদের আসরের অভিযোগও উঠেছে, যা নিয়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
মৃত মোবারকের পরিবার এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় তারা ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, পুরো ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এটি স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এই রহস্য উদঘাটনে এখন সবার দৃষ্টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর।
আপনার মতামত লিখুন :