নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা খাত বর্তমানে এক চরম বাণিজ্যিক নৈরাজ্যের শিকার। দ্বীপনগরীর বিভিন্ন ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলছে অতিরিক্ত টাকা আদায়, ভুল রিপোর্ট প্রদান, কমিশনভিত্তিক প্যাথলজি রেফারেন্স এবং অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত সেন্টারের রমরমা ব্যবসা। চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ যেন এক দুর্নীতির ফাঁদে আটকা পড়ে আছে।
রোগীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির মতো টাকা আদায় করা হচ্ছে। হাতিয়ার প্রায় প্রতিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হচ্ছে প্রকাশ্যে, যা এখন হাতিয়ার মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমিশন খাওয়ার উৎসবে ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মধ্যে এক অশুভ আঁতাত চলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বহু চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে রোগীকে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান, কারণ সেখান থেকে কমিশন পাওয়া নিশ্চিত। প্রতিটি রিপোর্টে ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমিশন ডাক্তার বা মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে যায়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত রোগীর ওপরই পড়ে।
রোগী বাড়ে, কমিশন বাড়ে, কিন্তু সঠিক রিপোর্টের সংখ্যা কমে যায়। অনেক ল্যাবেই দক্ষ টেকনোলজিস্ট নেই। রিপোর্ট ভুল হলে তার দায় কে নেবে? হাতিয়ার বেশ কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই সনদপ্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট, এমনকি এমবিবিএস প্যাথলজিস্টের স্বাক্ষরও থাকে না। অনেক সেন্টার প্যাথলজি রিপোর্টে কম দামের রি-এজেন্ট ব্যবহার করে, যার ফলে রক্তপরীক্ষা, থাইরয়েড, ডেঙ্গু, ইউরিন—সবক্ষেত্রেই নিয়মিত ভুল রিপোর্ট আসছে।
রোগী ভুল রিপোর্টে ভুল চিকিৎসা নিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে। অথচ প্রশাসনের তেমন নজরদারি নেই। অভিযোগ রয়েছে, হাতিয়া উপজেলা প্রশাসন এসব অনিয়ম দুর্নীতি জেনেও নীরবতা পালন করছে। শুধু ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতালে অনিয়ম নয়, সকল ক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে জেনেও তারা কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি এবং নিচ্ছেও না।
হাতিয়ায় আরেকটি লুকানো বাণিজ্য হলো, টেস্টের নাম করে খালি কাগজে সিল-স্বাক্ষর করা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী উপস্থিত না থাকলেও টেস্টের রিপোর্ট ‘সিরিয়াল দেখাতে’ আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়। মেডিকেল ইনভেস্টিগেশন ছাড়াই রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যকে বিপন্ন করছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ নির্বিকার। নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবসায়ীদের এই দৌরাত্ম্য, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের আশীর্বাদ ছাড়া সম্ভব নয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নিবন্ধনবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বছরের পর বছর ধরে চালু, কিন্তু কোনো বাস্তবিক অভিযান বা লাইসেন্স যাচাইয়ের তৎপরতা নেই। স্থানীয়রা বলছেন, হাতিয়ায় ডায়াগনস্টিক সেক্টর এখন খাঁচাবন্দি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। রোগী বাঁচবে না মরবে—এটাই যেন ব্যবসায়ীদের আগ্রহ নয়।
'স্বাস্থ্যসেবা নয়, এখানে চলছে নির্যাতন'—অতিমাত্রায় ফি, ভুল রিপোর্ট এবং কমিশন-ভিত্তিক চিকিৎসায় রোগীরা চরম ভুক্তভোগী। তথ্য অনুযায়ী, হাতিয়ার মোট ডায়াগনস্টিক বাণিজ্যের অর্ধেকই অনিয়ন্ত্রিত বা অবৈধভাবে চলছে। প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছে, কোনো আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ ডায়াগনস্টিক সেন্টার সরকারি খাল দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে, যা বর্ষা মৌসুমে হাতিয়া উপজেলার পৌরসভার সাধারণ জনগণের গলার কাঁটা হয়ে উঠবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মান্নান প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "ডাক্তার এক কথা বলে, রিপোর্ট আসে আরেক কথা। আমরা গরিব মানুষ—টাকা দিয়ে টেস্ট করি, কিন্তু রিপোর্টের ওপর ভরসা রাখতে পারি না। ভুল রিপোর্টে চিকিৎসা নিলে জীবনটাই ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।"
পৌরসভার বাসিন্দা ইমরান প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "অনেক সেন্টারে অপ্রশিক্ষিত লোক দিয়ে টেস্ট করানো হয়। ডাক্তারদের সাথে তাদের সিন্ডিকেট আছে—রোগী পাঠালে কমিশন দেয়। তারা সরাসরি জনগণের সাথে প্রতারণা করছে।"
বুড়িরচর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা হালিমা খাতুন (৪৫) প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "আমার রিপোর্ট ভুল আসার কারণে অন্য ওষুধ খেতে হয়েছিল। পরে চট্টগ্রামে গিয়ে আবার টেস্ট করে বুঝলাম আগের রিপোর্ট ভুল ছিল। আমরা তাহলে কার কাছে যাবো?"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা সদরের স্থানীয় একজন চিকিৎসক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে যারা শুধুই ব্যবসা করছে, স্বাস্থ্যসেবা না। অনেক সময় তারা ভুল বা নিম্নমানের রিপোর্ট দেয়, যা চিকিৎসকদের জন্যও বিব্রতকর। এই সেক্টরে মনিটরিং খুবই দুর্বল।"
এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হাতিয়া উপজেলার চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "হাতিয়ায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো যেন হয়ে উঠেছে এক ধরনের 'নিয়ন্ত্রণহীন স্বাস্থ্য ব্যবসা কেন্দ্র', যেখানে রোগ নির্ণয়ের চেয়ে লাভই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুল রিপোর্ট, অতিরিক্ত ফি, কমিশন বাণিজ্য আর অদক্ষ জনবল—সব মিলিয়ে এই খাত এখন সাধারণ মানুষের জীবনের জন্যই হুমকি হয়ে উঠছে।"
এই বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মানসী রানী সরকারকে অফলাইনে ও অনলাইনে বারবার কল দিলেও তিনি তা রিসিভ করেননি, তাই তার মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্বাস্থ্য খাতে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানালে তিনি তা রেসপন্স করেন না।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "আমি মাত্র জয়েন করেছি, আপাতত তেলের সিন্ডিকেট নিয়ে কাজ করছি, তারপর ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে কাজ করবো। তবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনিয়ম কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জরিমানা ও বন্ধের ব্যবস্থা করা হবে। জনগণের নিরাপত্তা আমাদের অগ্রাধিকার।"
নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন মরিয়ম সিমি প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, "ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনায় নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। লাইসেন্সবিহীন বা মানহীন সেবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে আরও তদারকি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।"
আপনার মতামত লিখুন :