মসজিদ উন্নয়ন প্রকল্পে ২ লাখ টাকার হদিস নেই

স্টাফ রিপোর্টার , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম: ধর্মীয় অনুভূতির অন্যতম কেন্দ্র মসজিদ। সেই মসজিদকে ঘিরে যদি উন্নয়নের নামে বরাদ্দ হওয়া সরকারি টাকার হিসাব মিলতে না চায়, তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এমনই এক রহস্য ঘিরে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের জমদুয়ারা গ্রামের একটি মসজিদ উন্নয়ন প্রকল্প।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে জমদুয়ারা গ্রামের একটি মসজিদের উন্নয়নের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন গল্প।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই অর্থ বছরে মসজিদের নামে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন কাজই হয়নি। অথচ মসজিদে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো হয়েছে এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষ ও মসজিদের তহবিলের দান-অনুদানের মাধ্যমে।

গ্রামের বাসিন্দাদের ভাষায়, “মসজিদের যে কাজ হয়েছে, তা এলাকার মানুষ নিজেদের টাকায় করেছে। সরকারি প্রকল্পের নামে গড়িমসি আড়াল করে আত্মসাতের চেষ্টা হয়েছে।”

এ বিষয়ে মসজিদ কমিটির সভাপতি হারুন বলেন, “২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে মসজিদের জন্য কোনো সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ আমরা পাইনি। মসজিদের কিছু কাজ হয়েছে স্থানীয় মসজিদ তহবিল, মানুষের দান এবং সহযোগিতায়। কেউ এক জায়গায় দিয়েছে, কেউ আরেক জায়গায় সহায়তা করেছে।”

তিনি আরও জানান, বর্তমানে মসজিদের পাশে একটি টয়লেট, অজুখানা ও স্টোররুম নির্মাণের কাজ প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস ধরে চলমান রয়েছে, যা মূলত স্থানীয়দের অর্থায়নেই হচ্ছে।

তবে ঘটনার মোড় নেয় আরও রহস্যজনকভাবে। এলাকাবাসীর দাবি, ২০২৬ সালে হঠাৎ করে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের প্রকল্পের একটি সাইনবোর্ড মসজিদের সামনে লাগানো হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই সাইনবোর্ড আবার সরিয়ে ফেলা হয়। এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও ক্ষোভ।

এলাকাবাসীর মতে, “যে প্রকল্পের কাজই হয়নি, সেখানে হঠাৎ করে স্থানীয়দের অনুদানের কাজে প্রকল্পের সাইনবোর্ড লাগানো হলো কেন? আবার সেটি সরিয়েই বা ফেলা হলো কেন?”

এই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে জোরালোভাবে প্রশ্ন উঠেছে—মসজিদ উন্নয়নের নামে বরাদ্দ দেওয়া সেই ২ লাখ টাকা গেল কোথায়? কারা এই টাকার নেপথ্যে ‘ঢাল’ হয়ে আছে?

এ বিষয়ে প্রকল্পের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচিত দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস স্টাফ মালেক বলেন, “ডিসি অফিস থেকে একটি অনুদান পেয়েছিলাম। সেখানে ১ লাখ টাকা পেয়েছি, আর ১ লাখ টাকা এখনো পাইনি। প্রক্রিয়া চলছে।”

তবে তিনি প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে তোসলেমের নাম উল্লেখ করে, নিজের সেক্রেটারি পদটিও আড়াল করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি তসলিম বলেন, “সরকারি অনুদান তো আমরা এ পর্যন্ত পাইনি, এই প্রথম পাইতে গেছি আর কি!”

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, “নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি এবং বিল আটকে রাখা হয়েছে। সন্দেহজনক বিষয় থাকায় বিল স্থগিত করা হয়েছে। ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, এটা নিয়ম অনুযায়ী অগ্রিম হিসেবে দেওয়া হতে পারে। বিষয়টি যাচাই করে বাকি টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থ জনগণের সম্পদ। উন্নয়নের নামে সেই অর্থ যদি অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের বক্তব্য—সরকারি অর্থের একটি টাকাও যেন অপচয় বা আত্মসাতের শিকার না হয়।

Link copied!