বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নে দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে চলছে জোত পারমিটবিহীন প্রাকৃতিক বনের মূল্যবান গাছ পাচার। সুয়ালকের কাইচতলী সড়ক হয়ে সাতকানিয়া পর্যন্ত প্রতিদিনই শতাধিক গাড়িতে কাঠ পাচার করছে একটি প্রভাবশালী চক্র, যা স্থানীয়দের মাঝে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুয়ালক, সুলতানপুর, কাইচতলী, কদুখোলা ও ভাগ্যকুল এলাকা থেকে প্রতিদিন অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি ট্রাক ও মিনি ট্রাকে করে এসব মূল্যবান গাছ পাচার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও বান্দরবান সদরের বিভিন্ন এলাকা কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কদুখোলা, ভাগ্যকুল ও কাইচতলী এলাকায় নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। বনভূমির ভেতরে চলছে কাঠ বোঝাই গাড়ির অবাধ চলাচল। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চল ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাগ্যকুল এলাকার মো. নুরুল আলম, মো. জসিম, মুস্তফা ও জয়নালসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই কাঠ পাচার বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
কদুখোলা বনের ভেতরে কাজ করা এক শ্রমিক, মো. মুন্সি মিয়া জানান, "আমি দিনমজুর। প্রতিদিন ৭০০ টাকা মজুরিতে নুরুল আলমের বাগানে কাজ করি। বাগানটি নুরুল আলম ও জসিম উদ্দিন শেয়ারে কিনেছেন।"
অভিযুক্ত মো. নুরুল আলমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাছ কাটার বিষয়টি স্বীকার করেন। বন বিভাগের অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, "মৌখিকভাবে অনুমতি নেওয়া হয়েছে।" পরে প্রতিবেদকের সাথে সরাসরি দেখা করার কথা বলে তিনি ফোন কেটে দেন।
এদিকে, সুয়ালক বাজারের পর একটি ব্রিজ পার হয়ে কাঁচা রাস্তা দিয়ে কয়েক মিনিট হাঁটলেই দেখা যায় একটি সেগুন বাগান। সেখানেও দিনের বেলায়ই চলছে গাছ কাটার কাজ। অথচ সেগুন গাছ কাটতে জোত পারমিট থাকা বাধ্যতামূলক, যা এখানে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সাথে মৌখিক সমঝোতার মাধ্যমে এই বননিধন চলছে। ফলে কোনো ধরনের কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না।
কাঠ পরিবহনে যুক্ত এক ট্রাকচালক, মো. ইসমাইল ড্রাইভার জানান, "গাছগুলো কদুখোলা থেকে নুরুল আলমের বাগান থেকে আনা হয়। আমি প্রতিদিন ৭-৮ গাড়ি কাঠ পরিবহন করি। আমার মতো আরও ৪০-৫০টি ডাম্পার নিয়মিত চলে। ভাগ্যকুল হয়ে লোহাগাড়া উপজেলার ঠাকুরদিঘী ও কাইচতলী রোড দিয়ে প্রায় শতাধিক গাড়ি প্রতিদিন কাঠ বহন করছে। আমি শুধু ভাড়ায় গাড়ি চালাই।"
এ বিষয়ে বান্দরবানের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, "সুয়ালকে কাঠ পাচারের বিষয়টি আগে জানা ছিল না। এখনই রেঞ্জ অফিসারদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। অবৈধ কাঠ পাচারকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।"
আপনার মতামত লিখুন :