মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরীর সদর সার্কেল ভূমি অফিসের আওতাধীন বাকলীয়া ভূমি অফিস, যেখানে নাগরিকদের দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। নানা অভিযোগে ঘিরে উঠেছে এই অফিসকে, যেখানে গড়ে উঠেছে একটি অঘোষিত ‘সিন্ডিকেট’, আর এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অফিসেরই ঝাড়ুদার জয়নাল আবেদিন, ওরফে আবু।
সরকারি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা না থাকলেও, অভিযোগ রয়েছে, এই আবুই কার্যত অফিসের ‘অঘোষিত বড় বাবু’। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে কাজ দ্রুত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি আদায় করছেন অতিরিক্ত অর্থ।
অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত। সরেজমিনে দেখা গেছে, অফিস সহকারী রহিমা সরাসরি সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে নগদ টাকা গ্রহণ করছেন। অথচ সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, ভূমি সংক্রান্ত সব ধরনের ফি পরিশোধ হওয়ার কথা অনলাইনের মাধ্যমে। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়মকে উপেক্ষা করে নগদ লেনদেনই হয়ে উঠেছে নিয়মিত চর্চা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘বিশেষ কারণ’ দেখানো এবং দ্রুত সেবা প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে এই অবৈধ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। একাধিক ভিডিও ফুটেজেও এমন কার্যক্রমের প্রমাণ মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একজন সাধারণ সেবা গ্রহীতা সেজে ঝাড়ুদার আবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, অনলাইন বা অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট না করে তার মাধ্যমেই কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। এ জন্য তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিক পরিচয় প্রকাশ পেলে তিনি নিজের অবস্থান পাল্টে দাবি করেন, “আমাদের হাতে কিছু নেই, সবকিছুই অনলাইনে হয়।”
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, একজন ঝাড়ুদার কীভাবে হয়ে উঠলেন অফিসের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক? আর এই অবৈধ অর্থ আদায়ের পেছনে কি শুধু তিনি একাই, নাকি রয়েছে একটি সুসংগঠিত চক্র?
এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট ‘বড় বাবুর’ কক্ষে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং অভিযোগ উত্থাপনের পর তাকে অন্য একটি কক্ষে গিয়ে অফিস সহকারী রহিমা ও ঝাড়ুদার আবুর সঙ্গে উত্তেজিত অবস্থায় আলোচনা করতে দেখা যায়, যা সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে।
গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিওতে তার কিছু বক্তব্য প্রকাশ পায়।
পরবর্তীতে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে একই সময়ে তার উপস্থিতির পাশেই অফিস সহকারী রহিমার নগদ অর্থ গ্রহণের দৃশ্য পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। পাশাপাশি ঝাড়ুদার আবু তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষরা অভিযোগ করলেও সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং পরবর্তীতে হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম মহানগর সার্কেল ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অনুসন্ধানে। একাধিক ভিডিও ফুটেজে উঠে আসা এই চিত্র পুরো সেবাব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন :