ময়মনসিংহ জেলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল—এই তিন মাসে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রেকর্ড হওয়ায় জনমনে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কোতোয়ালী, ত্রিশাল, গফরগাঁও, ফুলপুর, ফুলবাড়ীয়া, ভালুকা, গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল ও হালুয়াঘাটসহ বিভিন্ন থানায় এসব মামলা দায়ের হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, থানায় দায়ের হওয়া এসব মামলার একটি অংশ প্রেমঘটিত সম্পর্কের জটিলতা কিংবা পারস্পরিক বিরোধ ও শত্রুতার জেরেও হয়ে থাকে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কোতোয়ালী মডেল থানা ও ত্রিশাল থানায় তুলনামূলক বেশি মামলা রেকর্ড হয়। পাশাপাশি গফরগাঁও, ফুলপুর, ফুলবাড়ীয়া ও গৌরীপুর থানাতেও পৃথক ঘটনায় ধর্ষণ মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া গেছে।
মার্চ মাসে মামলার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। এ সময় কোতোয়ালী, ত্রিশাল, নান্দাইল, ভালুকা, ঈশ্বরগঞ্জ ও হালুয়াঘাট থানায় ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত হয়। একাধিক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
এপ্রিল মাসেও একই প্রবণতা অব্যাহত থাকে। কোতোয়ালীসহ জেলার বিভিন্ন থানায় নতুন করে মামলা দায়ের হয়। কিছু ঘটনায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা অপরাধের নৃশংসতা ও গুরুত্বকে নির্দেশ করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দায়েরকৃত মামলাগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেরিনা আক্তার বলেন, ধর্ষণ মামলা অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় প্রতিটি অভিযোগ গভীর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের সঠিকতা যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।” তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক চাপ বা ব্যক্তিগত বিরোধের প্রেক্ষাপটও মামলার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রকৃত অপরাধ আড়াল হওয়ার সুযোগ যেন না পায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়া হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণনির্ভর এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ধর্ষণ মামলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী দীপিকা পাল। তিনি বলেন, “ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে নানা বাধা ও ভয়ভীতির মধ্যে থাকেন। তাই তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।” তিনি আরও বলেন, অভিযোগ দায়েরের পর ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, মানসিক সহায়তা প্রদান এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং ভুক্তভোগীবান্ধব। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে দিকেও নজর দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।
এদিকে, ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধে সর্বাগ্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, “সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে এসে ধর্ষণবিরোধী অবস্থান নিতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।” তিনি আরও জানান, ধর্ষকদের বিরুদ্ধে শুধু আইনগত নয়, সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সচেতন মহল বলছে, ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের অপরাধের বৃদ্ধি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে তারা মনে করেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আপনার মতামত লিখুন :