পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত দুটি শব্দ হলো—‘সেটেলার’ ও ‘আদিবাসী’। শব্দ দুটি শুধু পরিচয়ের ভাষাগত প্রকাশ নয়; বরং এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ভূমির অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে এই দুই শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায়ই বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডের পূর্ব অঞ্চলের একাংশ হলো এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। আন্তর্জাতিক রূপরেখা ভারতের দক্ষিণাঞ্চল ও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল জুড়ে রয়েছে সীমানা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ৫০৯৩ বর্গমাইল বা ১৩২৯৫ বর্গ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তৃত জায়গায় জুড়ে গড়ে উঠেছে পার্বত্য অঞ্চল। এক কথা বলা যায় আমাদের পার্বত্য অঞ্চল খ্যাত অপরূপ দৃশ্যের মধ্যে সেখানে কি নেই স্রষ্টার অপরিসীম কল্পনার শক্তিতে অজস্র সম্পদের ও বাংলাদেশ নামক মানুষের জীবন চাহিদার ৬০% জোগান দাতা হিসাবে উৎপাদন হয় এই পার্বত্য অঞ্চলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট সীমান্ত সড়ক ১হাজার ৩৬ কিলোমিটার বলছে, কিন্তু গবেষনা মতে দেখা যায় সীমান্ত সড়ক ৭৩৫ কিলোমিটার ।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথে ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল একটা অভিন্নতায় রুপ ধারন করে আসছে এবং রাজনৈতিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণের সুরলাপ আচরণ বাংলাদেশ দেখালেও সার্বিকভাবে বন্ধু প্রীতম শব্দটা তারা হিংসাত্মক ভাবেই দেখেন। যেহেতু ভারতের বিগত একশত বছরের পূর্ব-পরিকল্পনা অখণ্ড- ভারত অংশ বিশেষ বাংলাদেশকে গিলতে পারেনি এবং অখণ্ড -ভারত মানচিত্র থেকে ছিটকে পড়েছে, সেই মাকড়শারজাল বুনতেই তারা সহজেই পিছুপা হবেন না।
তাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বিনষ্ট করতে ভূ-রাজনৈতিক ভাবেও বিশাল ষড়যন্ত্র চলছে। একের পর এক শব্দ ভিত্তিক ভাবে উসকিয়ে দিয়ে একটা মহল ফয়দা লুটার জন্য ওতপেতে আছে। ঔপনিবেশিক এক চক্রান্তের ইতিহাস ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দোলাকে অবসান ঘটিয়ে ইংরেজরা পূরো বঙ্গকে দখলে নেয়। তাদের মতোই করে শাসন কার্যক্রম চালাতে থাকে। খাজনা আদায়ের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে তখনকার সময়ে স্বল্প শিক্ষিত লোকগুলোকে চীপ সার্কেল হিসেবে পদবী দিয়ে তাদের দিয়ে খাজনা আদায় শুরু করে। তারাও অশিক্ষিত উপজাতিদের বুঝাতে শুরু করেন তারা হলেন রাজাবাহাদুর। ১৯০ বছর শাসন শোষণ চালিয়েছে বঙ্গ রাজ্যের উপর ইংরেজরা, নবাব প্রথা গুলো বাতিল করে তাদের সিস্টেমেটিক প্রথা চালু করে সর্বশান্ত করে দিয়ে গেছে বঙ্গরাজ্যটাকে। নবাবী আমলে তিনটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত সুবাহ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা অঞ্চলটি মূলত তাঁর নানা নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামল থেকে নবাবের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের পুরোটা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যার অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এই বৃহৎ প্রদেশ গুলো আলাদা করতে নবাবী শাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটা ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তের জাল বুনে। বাংলাটাকে একেবারে আলাদা করে দিয়ে ইংরেজরা বাঙালিদের মধ্যে তৃ-মুখী রাজনৈতিক সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়। বিভক্তি হয়ে পরে বঙ্গ রাজনৈতিক মতাদর্শ। ৪৭ সালে ইংরেজরা বিতারিত হলেও সুকৌশলে বাংলাকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়ে যায়। মানচিত্রটাকে গিলে খেতে দিয়ে যায় ভারতের হাতে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আরেকটা ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তের মধ্য ঠেলে দেয়। মানচিত্র গিলে খেতে তিন প্রদেশ খাওয়ার পর এখন বাংলাদেশের সীমানা থেকে আরও সাড়ে ৭ হাজার একর জায়গা ভারত সীমানায় ঢুকে গেলো। ২০১৫ সালে আওয়ামী সরকার খুশি করতে দাদা বাবুদের সীমানা নির্ধারণের নামে সুকৌশলে এই কাজটা করে দেন। যাই হোক মূল কথায় আসি পার্বত্য চট্টগ্রামের যে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক করে সেটা হলো ৯৭ সালের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় উপজাতি হিসেবে, তারপর তারা দাবী করলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ২০১৮ সাল থেকে থেকে দাবী উত্থাপিত আদিবাসী হিসেবে তারা থাকতে চায়। পৃথিবীতে ৮ টি দেশে প্রথম আদিবাসী চিহ্নিত করা হয় অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, আফ্রিকা মহাদেশ ও ওশেনিয়ার মতো ইউরোপীয়দের দ্বারা উপনিবেশিত বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্রগুলোয় আদিবাসীর মর্যাদা সাধারণত ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের পূর্বে সেখানে বসবাসকারী জনগণের সরাসরি বংশোদ্ভূত গোষ্ঠীগুলোর জন্য সমস্যাহীনভাবে প্রয়োগ করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীদের বাসস্থান এশিয়া ও আফ্রিকায় আদিবাসী জনসংখ্যার পরিসংখ্যান স্পষ্টতার দিক থেকে কম। তার মানে হচ্ছে যারা দুই হাজার বছর পূর্বে থেকে নিদিষ্ট স্হান গুলোতে বসবাস শুরু করে। আর "আদিবাসী" শব্দটি সাধারণত কোনো ভূখণ্ডের প্রাচীন ও স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যারা ঐ অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে আসছে। একই রুপে দাবী করতে চায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দেন। তাদের দাবি, তারা এই অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দা এবং তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে, যা বিশেষ স্বীকৃতির দাবি রাখতে আন্দোলন করছে। আসলে কি তাই বাংলাদেশের উপজাতিরা দুই হাজার বছর পূর্বে এসেছে নাকি ১৬-১৭শত খ্রীস্ট থেকে এই পার্বত্য অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে ‘সেটেলার’ শব্দটি মূলত তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যারা বিভিন্ন সময়ে দেশের ভিতর অন্য জেলা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বিপুল সংখ্যক বাঙালিকে পার্বত্য এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। এটাও যেমন সত্য তবে এই পার্বত্য অঞ্চলে একশত বছর পূর্বে থেকেও অনেক বাঙালী পরিবার বসতি স্হাপন করে বসবাস করে আসছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একাংশ এই জনগোষ্ঠীকে ‘সেটেলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। তবে অনেক বাঙালি বাসিন্দা এই শব্দটিকে বৈষম্যমূলক ও বিভাজন সৃষ্টিকারী বলে মনে করেন। তাদের যুক্তি, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ভোগ করেন।
পার্বত্যবাসীদের মনে আরেকটি প্রশ্ন রয়েছে, উপজাতিরা এসেছে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও চিন থেকে। তাদেরকে রিফিউজিও বলায় হয় তার প্রমাণ হলো শান্তিচুক্তি পর একটা উপজাতিয় শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। স্পষ্ট ভাবে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে তারা রিফিউজি (শরনার্থী) ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শব্দের এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অমীমাংসিত প্রশ্ন। কেবল পরিভাষা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের ন্যায্য অধিকার, ও সমঅধিকার বাস্তবায়ন এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও সম্প্রীতির স্বার্থে প্রয়োজন সংলাপ, সহনশীলতা এবং এমন ভাষা ব্যবহার, যা বিভাজনের বদলে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়াকে শক্তিশালী করে। শব্দের লড়াই নয়, সমাধানের পথই হওয়া উচিত সবার মাঝে শান্তির বার্তা।
লেখক :
কামাল পারভেজ
গণমাধ্যম কর্মী ও কলামিস্ট।
আপনার মতামত লিখুন :