ইতিহাসের আদালতে সততার জয়: ক্ষণস্থায়ী দম্ভ বনাম চিরস্থায়ী ভালোবাসার রাজনীতি--সিয়াম রশিদ

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ১১:১৩ এএম

ইতিহাসের আদালতে সততার জয়: ক্ষণস্থায়ী দম্ভ বনাম চিরস্থায়ী ভালোবাসার রাজনীতি--সিয়াম রশিদ

আজকের জটিল ও রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমাদের চেনা সামাজিক নৈতিকতার সংজ্ঞাটাই বুঝি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। সমাজে সততার পথ অবলম্বন করা, ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা কিংবা শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আজ যেন এক অলিখিত অপরাধে পরিণত হয়েছে। যেখানে চারপাশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে অবধারিতভাবে জোটে অবজ্ঞা, বৈরিতা আর গভীর একাকীত্ব; সেখানে দাঁড়িয়ে একজন বিবেকবান ও সংবেদনশীল মানুষের মন বেদনাকাতর হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এই সাময়িক অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পরিবর্তনের অমোঘ বীজ। ইতিহাসের চাকা কখনো এক জায়গায় থমকে থাকে না। সাময়িক ক্ষমতার দম্ভে যারা সত্যের কণ্ঠরোধ করতে চান, সময়ের নিষ্ঠুর ও নিরপেক্ষ ব্যবধানে তারা ঠিকই ধূলিসাৎ হয়ে হারিয়ে যান মহাকালের অতল গহ্বরে।

ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিপত্তি মানুষকে সাময়িক জৌলুস, চাকচিক্য আর কৃত্রিম স্তাবকতা দিতে পারে; কিন্তু মানুষের অকৃত্রিম ও চিরন্তন ভালোবাসা কখনো এনে দিতে পারে না। ভয় দেখিয়ে বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আনুগত্য আর ভেতর থেকে উথলে ওঠা গভীর শ্রদ্ধা কখনো এক জিনিস নয়। যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়, সাধারণের কণ্ঠরোধ করে নিজেদের আখের গোছায়, ক্ষমতাচ্যুতির পর সমাজ তাদের ইতিহাসের আঁস্তাকুড়েই ছুড়ে ফেলে দেয়। পক্ষান্তরে, যারা শত ঝড়-ঝাপটা, হুমকি আর প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন উপেক্ষা করে নিবিড়ভাবে শোষিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনড় থেকেছেন—তারাই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করে নেন। চামড়ার তৈরি রাজসিংহাসন আজ আছে কাল নেই, কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হৃদয়ের সিংহাসন চিরস্থায়ী ও অম্লান।

> "ইতিহাসের আদালতে বিচার কখনো ভুল হয় না। সময় ঠিকই ধুলোবালি ঝেড়ে আসল নায়ককে চিনে নেয় এবং খলনায়কদের ছুড়ে ফেলে দেয় নির্মমভাবে।"

আমরা যদি অতীতের মহাকাব্যিক অধ্যায়গুলোর দিকে ফিরে তাকাই, তবে দেখতে পাবো—ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে কেবল তাদের নামই চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে, যারা মানবকল্যাণে এবং সাম্যের প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জীবন সঁপে দিয়েছিলেন। কোনো অত্যাচারী, গণবিচ্ছিন্ন, দাম্ভিক বা দুর্নীতিবাজ শাসক সাময়িকভাবে প্রবল শক্তিশালী মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তারা কখনো ইতিহাসের প্রকৃত নায়ক হতে পারেনি। সাময়িকভাবে সৎ ও আদর্শবাদী মানুষদের পথ যতই কণ্টকাকীর্ণ, বন্ধুর কিংবা প্রতিকূল হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে জয় সবসময় সততারই হয়। যারা জনগণের নিঃস্বার্থ সেবায় নিজেদের নিবেদন করেন, তারা ব্যক্তিজীবনে হয়তো অনেক প্রতিকূলতা, কারাবরণ কিংবা কষ্টের মুখোমুখি হন; কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রকে তারা এক বুক আশা এবং বেঁচে থাকার তীব্র প্রেরণা জুগিয়ে যান।

একটি সুস্থ, সুন্দর, মানবিক ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের জন্য সততা ও নৈতিকতার কোনো বিকল্প হতে পারে না। অন্যায় আর দুর্নীতির কালো মেঘ সাময়িকভাবে সামাজিক আকাশকে অন্ধকার করতে পারে, কিন্তু সূর্যের প্রখর ও শাশ্বত আলোকে চিরতরে ঢেকে রাখা অসম্ভব। এই অন্যায়ের অন্ধকার ভেদ করে একটি নতুন ভোরের প্রত্যাশায় আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কিছু জরুরি প্রত্যয় ও মূল্যবোধ ধারণ করা আবশ্যক:

 

* চরম প্রতিকূলতা ও বৈরিতার মাঝেও যেন সমাজের ভালো ও বিবেকবান মানুষেরা পথ হারানোর ভয়ে গুটিয়ে না যান। তাদের সাহসের ভিত শক্ত করতে হবে।

*  রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে—বিচারালয় থেকে শুরু করে গণমাধ্যম পর্যন্ত—যেন কোনো প্রকার ভয়ভীতি ছাড়া সত্য ও ন্যায়ের জয় নিশ্চিত করা যায়, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

* যারা কোনো প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া নিঃস্বার্থভাবে দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করছেন, তাদের যেন সামাজিক একাকীত্বে ভুগতে না হয়; বরং তাদের প্রাপ্য সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

লাল-সবুজের এই প্রিয় বাংলাদেশে সততা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ের সংস্কৃতি আবার সগৌরবে ফিরে আসুক—এটাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। জনগণের পাশে দাঁড়ানো নিঃসঙ্গ, আদর্শবাদী মানুষগুলো যেন আর কখনো রাষ্ট্র বা সমাজের অবহেলার শিকার না হন, একাকীত্বে না ভোগেন। বরং তাদের সেই সততা, আজীবন ত্যাগ আর বলিষ্ঠ হাত ধরেই গড়ে উঠুক একটি টেকসই, মানবিক, স্বৈরাচারমুক্ত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং মানুষের অধিকার এবং ভালোবাসাই হবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি।

Link copied!