পোশাক বাজারে মন্দা, দেশের অর্থনীতি বাজে সংকেত, এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?

দেশের পোশাক ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কেবল ব্যক্তিগত আর্থিক সংকটের গল্প নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির এক উদ্বেগজনক চিত্র। ঈদুল আযহা মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে সাধারণত সপ্তাহজুড়ে দেশের সব বাজার, বিশেষ করে পোশাকের বাজার, চলে প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারের ঈদের আগে দেশের পোশাক বাজারের যে চিত্র দেখা যায়, তাতে স্পষ্ট হয়ে যায়- বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি ভীষণ কঠিন সময় পার করছে। ক্রেতার ভিড় নেই, বেচাকেনা নেই; বরং আছে হতাশার দীর্ঘশ্বাস। এই দৃশ্য শুধু দেশের দু এক জায়গায় নয়, রাজধানীর সহ দেশের সবখানেই অনেকটাই একই রকম, তা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এমন হচ্ছে? উত্তরটা খুব সহজ ও সোজা। গত কয়েক বছরের বেশি সময় ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হাত থেকে ক্রয়¶মতা প্রায় কেড়ে নিয়েছে। যার মাসিক আয় ২০-২৫ হাজার টাকা, তাকে যখন চাল-ডাল-তেল-সবজি-ঔষধ কিনতেই হিমশিম খেতে হয়, তখন ঈদের জন্য নতুন পোশাক কেনার কথা ভাবা বিলাসিতা। সংসারের অন্য খরচ বাদ দিয়েও জমানো টাকায় এক টুকরো পোশাক কেনার সাধ অনেকের নেই। চাকরিহারা কিংবা আয়হীন মানুষটির তো কথাই নেই। শুধু তা-ই নয়, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় বাজারেও পোশাকের দাম বেড়েছে।

উৎপাদন ব্যায় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও আগের মতো কম দামে পণ্য দিতে পারছেন না। আর এর মাঝে দেশের খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের হাহাকার-দোকানে বসেই কাটছে সময়, নেই বিক্রি, নেই টাকা। এই পরিস্থিতি থেকে পরিষ্কার উপলব্ধি হচ্ছে- বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা শুধু পুঁজিবাজার বা রপ্তানি খাতের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। মানুষের হাতে টাকা নেই, কেনার সক্ষমতা কমে গেছে। কেউ যখন খাবার জোগাড় করতে পারে না, তখন নতুন শার্ট বা শাড়ি কেনার চিন্তা তার কাছে অর্থহীন। শুধু পোশাক শিল্প বা খুচরা বাজার নয়, দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্বাস্থ্যের জন্য ভোক্তা চাহিদা টিকিয়ে রাখা জরুরি। ক্রেতার কাছ থেকে টাকা না বেরলে ব্যবসা টিকবে না, উৎপাদন কমবে, চাকরি যাবে, বেকারত্ব বাড়বে, আর সেই বেকার মানুষেরা খাবারও কিনতে পারবেন না- একটি দুষ্টুচক্র শুরু হয়ে যায়। দেশের পোশাক বাজারে করুণ দশা, তাই শুধু স্থানীয় সংবাদ নয়।

এটি একটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। বড় বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, প্রকৃত প্রমাণ মিলবে সাধারণ মানুষের কেনার সামর্থ্যের মধ্যেই। আজকে মানুষ যদি ঈদের পোশাক কিনতে না পারে, তাহলে আগামীকাল হয়তো তারা ঔষধ কিনতে পারবে না, পড়ালেখার খরচ চালাতে পারবে না।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট ও পাইকারি পর্যায়ের মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্য বাফার স্টক মজবুত করে কম দামে খোলা বাজারে চাল, ডাল, তেল ও চিনি বিক্রির উদ্যোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। ‘টিসিবি’র মাধ্যমে কম মূল্যে পণ্য দেওয়ার পরিধি বাড়ানো গেলে নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে কিছু টাকা বাঁচবে, যা তারা ঈদের কেনাকাটায় খরচ করতে পারবেন। কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজ দেওয়া যেতে পারে। গ্রামীণ অবকাঠামো ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ও এনজিওর স্বল্পসুদে ঋণ সহায়তা চালু করতে হবে, যাতে তারা নতুন কালেকশন আনতে পারে এবং ছাড় দিতে পারে। ব্যবসায়ীদের নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল বদলাতে হবে, সাশ্রয়ী মূল্যের (৫০০-১০০০ টাকার মধ্যে) পোশাকের কালেকশন বাড়াতে হবে। ‘থ্রি-পিস’, ‘পাঞ্জাবি’, ‘টিশার্ট’ ও শিশুপোশাকের ক্ষেত্রে মান ধরে রেখে দাম কমানো সম্ভব। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক লাইভ বিক্রি জোরদার করতে হবে। অনেক ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে ‘ঈদ মেলা’ বা ‘পপ-আপ শপ’ করছেন, সেই ধারাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া দরকার। ডেলিভারি চার্জ কমিয়ে হোম ডেলিভারির সুবিধা বাড়ালে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা সাড়া দেবেন।

পোশাক আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে সরকারি শুল্ক ও কর কিছুটা কমানো হলে দাম কমতে পারে- ইতিমধ্যে পোশাক খাতে ভ্যাট বেশি রয়েছে, যা সাশ্রয়ী পোশাকের ক্ষেত্রে ৫% বা তার নিচে নামিয়ে আনা যেতে পারে। এর ফলে ব্যবসায়ীরাও কম দাম রাখতে উৎসাহিত হবেন, আবার ক্রেতাদেরও স্বস্তি মিলবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করতে হবে, নিম্ন আয়ের চাকরিহার, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভাতা ও নগদ সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো জরুরি। বেকারত্ব ভাতা চালুর বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। এসব নগদ সহায়তা সরাসরি অর্থনীতিতে পাম্প হলে স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। ‘মায়ের জন্য টাকা’, ‘উপবৃত্তি’ ইত্যাদি প্রকল্পের অর্থ যেন ঈদের সময়ের আগে পাওয়া যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানোর কৌশল নিতে হবে- স্থানীয় পোশাক শিল্পে আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাট, তুলা ও স্থানীয় তাঁতের কাপড়ের প্রচলন বাড়ানো গেলে আমদানি ব্যয় কমবে, দামও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জ্বালানি সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে পোশাক উৎপাদন ও পরিবহনে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন- মুদ্রাস্ফীতি

লক্ষ্য মাত্রা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নীতি সুদ ও ডলারের বিনিময় হার  এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং উৎপাদন ব্যাঘাত না ঘটে।

সরকারের কর সংগ্রহের পরিধি বাড়িয়ে রাজস্ব ফাঁকি রোধ করতে হবে, যাতে উন্নয়ন ও ভর্তুকি খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো যায়।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের পকেটের অর্থনীতির ব্যবধান যাতে না বাড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে এখনই। একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পোশাক ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা যেন জাতীয় নীতি- নির্ধারকদের অজুহাত না হয়ে বরং সচেতনতার ঘণ্টা হয়। ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও প্রশাসন- তিন পক্ষের  আন্তরিক সমন্বয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন। আশা করা যায়, চলমান ঈদের বাজারের করুণ চিত্র যেন ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হয় এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এবারের ঈদ তাই আমাদের জন্য শিক্ষা হওয়া উচিত। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির এই দানবকে জব্দ না করতে পারলে বড় বড় উৎসবও হয়ে উঠতে পারে দুঃখের। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের পকেটের অর্থনীতির ব্যবধান যাতে না বাড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে এখনই। একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের পোশাক ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা যেন জাতীয় নীতি-নির্ধারকদের অজুহাত না হয়ে বরং সচেতনতার ঘণ্টা হয়- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক:

আক্তারুল ইসলাম

সাংবাদিক ও গবেষক

 

 

Link copied!