বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এর প্রশাসন ক্যাডারে সরকারি বেতন স্কেলের (৯ম গ্রেডে) একজন সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তরুণদের কর্মজীবন শুরু হয়। মেধা, কঠোর পরিশ্রম,ধৈর্য আর তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই তারা রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। স্বাভাবিকভাবেই এটি একটি গৌরবময় অর্জন এবং তরুণ সমাজের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো,বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে—এই গৌরবের স্থানটি অনেক ক্ষেত্রে রূপ ধারণ করছে এক ধরনের অলীক ও অনভিপ্রেত অহংকারে। মাঠ প্রশাসনে সাধারণ মানুষকে অবমূল্যায়ন করা, অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কিছু খণ্ডচিত্র সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের মানুষের মাঝে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, যেমন—সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কার্যালয়গুলোতে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সবসময় সুখকর হচ্ছে না।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উদয় হয় —যে মেধা দেশসেবার ব্রত নিয়ে সিভিল সার্ভিসে এলো, চেয়ারে বসার পরপরই তা কেন অহংকারে রূপ নেয়?আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক আমল থেকেই আমলাতন্ত্রকে এক ধরনের ‘প্রভুত্ব’ বা ‘শাসক’ শ্রেণির রূপ হিসেবে দেখা হয়েছে। আমরা এখনো সেই মানসিকতার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি।
সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা তরুণ বয়সেই বিশাল প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইনি এখতিয়ার এবং প্রটোকল পেয়ে যান। এই অল্প বয়সে হঠাৎ পাওয়া বিপুল ক্ষমতা এবং পারিপার্শ্বিক ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ সম্বোধনের সংস্কৃতি অনেকের মনকে নেতিবাচকভাবে বদলে দেয়। তারা অনেক সময় ভুলে যান যে, এই ক্ষমতার মূল উৎস রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ। ফলে ‘সেবক’ হওয়ার সাংবিধানিক ও নৈতিক মানসিকতার জায়গায় এক ধরনের ‘শাসক’ সুলভ অহংকার এসে ভর করে।
শিক্ষা ও মেধা মানুষকে বিনয়ী করে তোলে। একজন কর্মকর্তা যখন কোনো সাধারণ সেবাগ্রহীতার সাথে রূঢ় আচরণ করেন বা তাকে অবমূল্যায়ন করেন, তখন মূলত তার নিজের শিক্ষার গভীরতা এবং পারিবারিক শিক্ষার মানই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
কৃষক, শ্রমিক, কিংবা সাধারণ দিনমজুর—যাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা করের (ট্যাক্স) টাকায় রাষ্ট্রের পুরো প্রশাসন চলে, তাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকানো বা তাদের তুচ্ছ ভাবা চরম নৈতিক স্খলনের শামিল। মেধার প্রকৃত সার্থকতা কেবল লাল ফিতার ফাইলে সই করায় কিংবা সরকারি দামি গাড়ি ব্যবহারে নয়; মেধার সার্থকতা হলো সাধারণ মানুষের চোখের ভাষা বুঝতে পারা এবং তাদের আইনি অধিকারটুকু সম্মানজনকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া।
একটি দেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন জনবান্ধব প্রশাসন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার উদ্ধত আচরণ ও অহংকার সাধারণ মানুষের সাথে সরকারের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করছে। সেবাগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি হেনস্তা, অবমূল্যায়ন ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসগুলোতে, যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে একজন কর্মকর্তার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করা। সেখানে অহংকার বা ক্ষমতার দাপট দেখালে তা শুধুমাত্র ওই ব্যক্তির ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং পুরো সিভিল সার্ভিসের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে।
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শাসকেরা সবসময় বিনয়ের নীতিতেই রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনা করেছেন। ক্ষমতার চেয়ার যে চিরস্থায়ী নয়—এই ধ্রুব সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যায়, ততই মঙ্গল।
এই তরুণ কর্মকর্তাদের সামনে এক বিস্তীর্ণ ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। তারা চাইলে তাদের মেধা ও ক্ষমতাকে অহংকারের হাতিয়ার না বানিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক করে তুলতে পারেন। মনে রাখতে হবে, পদমর্যাদা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান চিরস্থায়ী। অহংকার মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, আর বিনয় মানুষকে করে তোলে বরণীয়। প্রশাসন ক্যাডারের নবীন কর্মকর্তাদের হাত ধরে একটি মানবিক, বিনয়ী ও সত্যিকারের জনবান্ধব আমলাতন্ত্র গড়ে উঠুক—এটাই হোক প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :