শমসেরনগর বিমানবন্দর: পুনর্জাগরণের স্বপ্নে মৌলভীবাজার

একসময় সিলেট অঞ্চলের আকাশপথ যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল শমসেরনগর বিমানবন্দর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি এটি ছিল বৃহত্তর মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষের গর্ব ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু সময়ের প্রবাহে দীর্ঘদিন অচল হয়ে পড়ে থাকা এই ঐতিহাসিক বিমানবন্দর এখন আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। পুনরায় চালুর সরকারি ঘোষণার পর নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মৌলভীবাজার জেলার মানুষ।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, দেশের দীর্ঘদিন অচল থাকা কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে শমসেরনগর বিমানবন্দরও। বাংলাদেশ এভিয়েশন ট্যুরিজম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এটিজেএ)-এর সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

এই ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রবাসী কমিউনিটিতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হয়তো আবারও প্রাণ ফিরে পাবে শমসেরনগরের আকাশ।

প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার-এর মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল নিজ জেলায় বিমান যোগাযোগ চালুর। বর্তমানে আকাশপথে যাতায়াতের জন্য জেলার বাসিন্দাদের নির্ভর করতে হয় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর ওপর। এতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ে। বিশেষ করে বিদেশফেরত প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের জন্য বিষয়টি দীর্ঘদিনের একটি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের আশা, শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন সহজ হবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রুট চালু করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর যাতায়াত আরও সহজ ও আরামদায়ক হবে।

শুধু যাতায়াত নয়, এই বিমানবন্দর চালু হলে মৌলভীবাজার জেলার অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চা-বাগান, পাহাড়ি সৌন্দর্য, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাওর ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ হলে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও লাভবান হবে।

ব্যবসায়ী মহলের মতে, বিমানবন্দর চালু হলে চা শিল্প, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং পুরো অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, শমসেরনগর ছাড়াও পুনরায় চালুর পরিকল্পনায় রয়েছে বগুড়া বিমানবন্দর, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর, ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর, লালমনিরহাট বিমানবন্দর, কুমিল্লা বিমানবন্দর এবং পটুয়াখালী বিমানবন্দর-সহ দেশের আরও কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর।

তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘোষণা যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে পুনরায় চালু হোক শমসেরনগর বিমানবন্দর। দীর্ঘদিনের এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিলে বদলে যেতে পারে মৌলভীবাজারের যোগাযোগ, পর্যটন ও অর্থনীতির চিত্র। 

জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং তৎকালীন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটি হিসেবে নির্মাণ করা হয় শমসেরনগর বিমানবন্দর। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশরা জাপান, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার (বার্মা) ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার কৌশলগত উদ্দেশ্যে একসঙ্গে দুটি বড় বিমানবন্দর নির্মাণ করেছিল; তার একটি ছিল কমলগঞ্জের শমসেরনগর বিমানবন্দর।

তৎকালীন সময়ে এর নাম ছিল ‘দিলজান্দ বন্দর’। স্বাধীনতার পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শমসেরনগর বিমানবন্দর’।

কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর চা বাগানের প্রায় ৬২২ একর জমি অধিগ্রহণ করে নির্মিত হয় এ বিমানবন্দর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সৈনিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানে নির্মাণ করা হয়েছিল বহু বাংকার ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। পাকিস্তান আমল এমনকি স্বাধীনতার পরও এসব স্থাপনা অনেকাংশে অক্ষত ছিল।

১৯৬৮ সালে একটি দুর্ঘটনার পর বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৭০ সালে পিআইএর একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জরুরি অবতরণের সময় দুর্ঘটনায় পতিত হলে বিমানবন্দরের বেশ কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় আগুনে বহু স্থাপনা পুড়ে যায়।

এরপর ১৯৭৫ সালে এখানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি ইউনিট স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে চালু করা হয় বার্ষিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বর্তমানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টার এখানে ওঠানামা করছে। বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ হাজার ফুট এবং প্রস্থ ৭৫ ফুট। গত কয়েক বছর ধরেই এই রানওয়েতে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান নির্বিঘ্নে অবতরণ করছে।

বর্তমানে বিমানবন্দরের অব্যবহৃত জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে কৃষি খামার। পাশাপাশি এখানে বিমানবাহিনীর রিক্রুটমেন্ট অফিসও পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জাতীয় ক্যাডেট কোর বিমান শাখার সদস্যদের অগ্নিনির্বাপন, প্রাথমিক চিকিৎসা, রাডার নিরাপত্তা ও ফায়ারিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

১৯৯৫ সালে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে বেসরকারিভাবে অ্যারোবেঙ্গল এয়ার সার্ভিসের ফ্লাইট চালু হলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও যাত্রী সংকটের কারণে তা টেকেনি। পরে পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

আজও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা ঐতিহাসিক এই বিমানবন্দর আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হোক, আর শমসেরনগরের আকাশে ফিরুক যাত্রীবাহী বিমানের ব্যস্ততা।

Advertisement

Link copied!