বাকেরগঞ্জে হালিম হত্যা: চাঁদাবাজ ও ভূমিদস্যু চক্রের নেপথ্যে কাহিনি উন্মোচন

মোঃ বশির হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

অভিযোগের কেন্দে‘ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট’

ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই বলয়ের সংযোগ

‘চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ’

অপরাধী যে দলেরই হোক কোন ছাড় নেই, পুলিশ সুপার 

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার হেলেঞ্চা এলাকায় বালুভরাটকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ব্যবসায়ী হালিম হাওলাদার হত্যা মামলায় এবার একে একে বেরিয়ে আসছে অভিযুক্তদের পরিচয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং কথিত ভূমিদস্যু ও চাঁদাবাজ চক্রের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক।

গত ১৫ মে সংঘটিত ওই হামলায় নিহত হন ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের বড় ভাই হালিম হাওলাদার (৭০)। ঘটনার পরদিন ১৬ মে নিহতের ছোট ভাই দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে বাকেরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ২৪/১৫৫। মামলায় ১৩ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি এবং আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে ‘ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট’: তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলার অধিকাংশ আসামিই দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, বালুভরাট নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত  শফিকুল ইসলাম রিপন ওরফে ‘ডিগ্রি রিপন’: মামলার ১ নম্বর আসামি মো. শফিকুল ইসলাম রিপন ওরফে ডিগ্রি রিপনের বিরুদ্ধে রয়েছে জমি দখল, হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং জাল স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগ।

স্থানীয়রা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ: ২ নম্বর আসামি মাহমুদুন্নবী সুমন হাওলাদারকে হামলার নেতৃত্বদানকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি নিজেকে ছাত্রদল নেতা পরিচয় দিলেও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি চাঁদাবাজি ও বালুভরাট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে সাংবাদিককে হত্যার হুমকি ও একাধিক মামলার অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই বলয়ের সংযোগ: ৩ নম্বর আসামি আবুয়াল হোসেন আওয়াল স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি গারুরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। পরে তিনি রিপন ও সুমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ৪ নম্বর আসামি কালাম হাওলাদারের বিরুদ্ধেও জবরদখল ও ভুয়া নিলাম ডিগ্রির মাধ্যমে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, তিনিও একই চক্রের সক্রিয় সদস্য। মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে, কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং পরিচালনা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। ৫ নম্বর আসামি উজ্জ্বল হাওলাদারকে স্থানীয়রা মাদকসেবী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।৭ নম্বর আসামি রাহাত হাওলাদারের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ৮ নম্বর আসামি শাকিল মোল্লা এবং ১২ নম্বর আসামি সোহাগ মোল্লাকেও স্থানীয়ভাবে মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে। সোহাগ মোল্লা যুবলীগের সক্রিয় কর্মী তার বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ‘চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ’: বাদী দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, তিনি নিজস্ব জমিতে বালুভরাটের কাজ শুরু করলে অভিযুক্তরা এসে চাঁদা দাবি করে। তিনি দাবি করেন, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসে চাঁদা দাবি করা হতো।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ মে তিনি বাড়িতে না থাকার সুযোগে অভিযুক্তরা তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং জমির একটি অংশ নিজেদের দাবি করে বেড়া দেয়। পরে তিনি দেশে ফিরে কাজ শুরু করলে সশস্ত্র দলবল নিয়ে এসে বাধা সৃষ্টি করা হয়।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, তারা অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে হামলা চালালে আমার বড় ভাই হালিম হাওলাদার আমাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। তখন তাদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। এ ঘটনায় দেলোয়ার হোসেনসহ আরও কয়েকজন আহত হন। কারা গ্রেপ্তার,কী বলছে পুলিশ: বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের কাগজকে জানান,গত শুক্রবার (২২ মে) আমি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলেছি। কোন অপরাধী অপরাধ করে পার পাবে না। অপরাধীদের আমরা সব্বোর্চ শাস্তি নিশ্চিত করব। সে যে দলেরই হোক অপরাধ করলে কোন ছাড় নেই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজু জানিয়েছেন, এজাহারভুক্ত ৪ ও ৫ নম্বর আসামিকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক: স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী চক্র এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না। হালিম হাওলাদার হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

 

Link copied!