চোখের পলকে বাস গেল পদ্মায়, নিয়মের কড়াকড়িতে তীরে বেঁচে রইলেন যাত্রীরা!

নাজমুল হোসেন , গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম

ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যাওয়ার পরও অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন শত শত যাত্রী। ফেরিতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে বাসের সব যাত্রীকে নিচে নামিয়ে দেওয়ায় একটুর জন্য এড়ানো গেছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

শুক্রবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে এই অলৌকিক ও স্বস্তির ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার কবলে পড়া ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের নন-এসি বাসটি উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় নদী থেকে টেনে তোলা হয়েছে। দুর্ঘটনায় বাসের চালক মো. ঝন্টু আলী (৪৮) ও হেলপার মো. সাকিব (২১) সামান্য আহত হলে তাদের উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

ঘাট কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৭টা ২০ মিনিটে মেহেরপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা যাত্রীবোঝাই বাসটি সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছায়। ঘাট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী করবী-অক্সফ্যাম ফেরিতে ওঠার ঠিক আগে বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। যাত্রী নামার পরপরই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেরির র‍্যাম্প ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে পুরোপুরি ডুবে যায়।

বাসের শেষ যাত্রী প্রত্যাশা বলেন, "গাড়িতে প্রচুর যাত্রী ছিল। ঘাটে আসার পর আমাদের নামিয়ে দেওয়া হয়। আমিই সবার শেষে বাস থেকে নেমেছি। আমার নামার ঠিক পরপরই চোখের সামনে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। বাসে তখন শুধু ড্রাইভার আর হেলপার ছিলেন। আল্লাহ আমাদের অলৌকিকভাবে বাঁচিয়েছেন।"

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ্ উদ্দিন জানান, স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নির্দেশ রয়েছে—দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরিতে ওঠার আগেই বাসের সব যাত্রী নামিয়ে দিতে হবে। সেই নির্দেশনা শতভাগ মেনে যাত্রী নামানোর কারণেই আজ শত মানুষের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।

দুর্ঘটনার পর পরই বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ ও স্থানীয়দের যৌথ প্রচেষ্টায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। বিআইডব্লিউটিএ-এর সদস্য (প্রকৌশল) রকিবুল ইসলাম তালুকদার সরাসরি উপস্থিত থেকে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন। পরে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ডুবে যাওয়া বাসটি নদী থেকে ওপরে তোলে।

ঘটনাটি জানতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাথী দাসসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, "দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার মাধ্যমে বাসটি নদী থেকে তোলা হয়েছে। বাসে কোনো যাত্রী না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি।

যাত্রীদের মালামালও উদ্ধার করে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।" তবে দুর্ঘটনার পর ৭ নম্বর ফেরিঘাট দিয়ে সাময়িকভাবে যানবাহন পারাপার বন্ধ রাখা হয়।

গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, "যাত্রী নিরাপত্তার জন্য ফেরিতে ওঠার আগে বাস খালি করতে অনেক সময় আমাদের বেগ পেতে হয়। অনেক যাত্রী নামতে চান না। আজ যদি এই নিয়মটি মানা না হতো, তবে কাউকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। এই ঘটনা প্রমাণ করে, নিয়ম মানলে কীভাবে বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়।"

ঘাট সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগেও বিভিন্ন সময় ফেরিঘাটে পন্টুন বা র‍্যাম্প থেকে যানবাহন নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অতীতের সেই সব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তৈরি করা যাত্রী নিরাপত্তার এই নিয়মটিই আজ শত শত পরিবারের মুখে হাসি ধরে রাখল।

উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ৩ নম্বর পল্টুনে ফেরিতে ওঠার সময় 'সৌহার্দ্য পরিবহনে'র একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে ২৬ জন যাত্রী নিহত হয়েছিলেন।

সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রী নামানোর কড়া নির্দেশ দেয় স্থানীয় প্রশাসন। আজ সেই নিয়ম মানার কারণেই বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা পেল।

 

 

Advertisement

Link copied!