রূপগঞ্জে ভোরের কাগজের সাংবাদিকের পরিবারকে সপরিবারে গুলি করে হত্যার হুমকি, থানায় জিডি

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ডিজিটাল বিভাগের সাংবাদিক মাহফুজ খানের পরিবারকে সপরিবারে গুলি করে হত্যার হুমকি, বাড়ি ভাঙচুর ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ইমরান ভূঁইয়া ওরফে শুভ (৩০) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকের মাতা মিনারা খানম বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৪৬৩) দায়ের করেছেন। ঘটনার পর থেকে ভোরের কাগজের সাংবাদিক মাহফুজ খানের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

লিখিত অভিযোগ, জিডি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিবাদী ইমরান ভূঁইয়া শুভ (পিতা- মৃত সবুর ভূঁইয়া, সাং- তারাবো উত্তরপাড়া) ভোরের কাগজের সাংবাদিক মাহফুজ খানের বন্ধু হওয়ার সুবাদে তাদের রূপসী গন্ধর্বপুর হাজেরা নগরস্থ বাসভবনটি ক্রয় করার চুক্তি করে। গত জানুয়ারি মাসে সরলতার সুযোগ নিয়ে বাড়ির মর্টগেজ লোনসহ মোট ৭৩ লক্ষ টাকা পরিশোধ করলেও বাকি ১৭ লক্ষ টাকা বকেয়া রেখেই বিভিন্ন মৌখিক আশ্বাসে বাড়ির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করে নেয়। এছাড়া সাংবাদিক মাহফুজের একটি মোটরসাইকেলের ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকাও সে আজ অবধি পরিশোধ করেনি। অর্থাৎ বাড়ি ও মোটরসাইকেল বাবদ বিবাদী শুভর কাছে ভুক্তভোগী পরিবারের সর্বমোট ১৯ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।

রেজিস্ট্রির দিন এনআইডি ও আগে চেক চুরি: অভিযোগের বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, আজ থেকে আনুমানিক ৪/৫ বছর পূর্বে বিবাদী শুভ ভুক্তভোগীদের বাসা ও দোকানে নিয়মিত যাতায়াত ও একসাথে চলাফেরা করার সুবাদে তাদের অলক্ষ্যে দোকান থেকে বেশ কয়েকটি ব্ল্যাঙ্ক চেক চুরি করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে জালিয়াতির উদ্দেশ্যে এবং সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ হিসেবে, গত জানুয়ারি মাসে বাড়ির রেজিস্ট্রির দিন অত্যন্ত চতুরতার সাথে সে ভুক্তভোগী মিনারা খানমের মূল জাতীয় পরিচয়পত্রটিও নিজের জিম্মায় হাতিয়ে নেয়। বর্তমানে সেই বকেয়া পাওনা টাকা না দেওয়ার উদ্দেশ্যে এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে উক্ত চুরি করা চেকে ও এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে কাল্পনিক অংকের টাকা বসিয়ে মিথ্যা মামলা ও ব্ল্যাকমেইলের প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে শুভ।

মানবিক আশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে বাড়ি দখলের চেষ্টা ও মাদক সেবনের অভিযোগ: ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, গত ০৬/০৪/২০২৬ তারিখে বিবাদী শুভ তার দ্বিতীয় স্ত্রী রিয়া-সহ গভীর রাতে অসহায় অবস্থায় এসে সাংবাদিক মাহফুজের বাসায় আশ্রয় প্রার্থনা করে। সে সময় বিবাদী শুভ অত্যন্ত ভালো সেজে ও মায়াকান্না কেঁদে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের মাতাকে বলে, "আন্টি, আগের বাসার মালিক আমাদের বের করে দিয়েছে, সব আসবাবপত্র ছাদে ফেলে রাখায় নষ্ট হচ্ছে, আমরা এখন কোথায় যাব?" সম্পূর্ণ মানবিক কারণে এবং সরল বিশ্বাসে তাদেরকে ঘরের একটি কক্ষে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই শুভ তার আসল রূপ ধারণ করে।

পূর্বের ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদ হয়ে মাঝরাতে জোরপূর্বক মালপত্র নিয়ে এসে একটি কক্ষ অবৈধভাবে দখল করে পুরো পরিবারকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য তীব্র মানসিক নির্যাতন শুরু করে সে। শুভ কৌশলে ঘরের দরজার লক (তালা) সম্পূর্ণ খুলে চুরি করে নিয়ে যায়, যাতে ভুক্তভোগীরা নিজেদের ঘরে তালা দেওয়ার अधिकारটুকুও হারিয়ে ফেলেন। এমনকি বাড়ির বৈধ দখলদারকে তোয়াক্কা না করে গত মাসে শুভ ওই বাড়ির এক ভাড়াটিয়াকে চরম ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক এক মাসের ভাড়ার টাকা চাঁদা হিসেবে তুলে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ২০শে এপ্রিল এই নিয়ে স্থানীয় গন্ধর্বপুর ও তারাবো এলাকার রাজনৈতিক ও গণ্যমান্য নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সালিশি বৈঠক হলেও শুভ তা সম্পূর্ণ অমান্য করে।

শুভ প্রায়শই গভীর রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে বাইরে থেকে এসে তার দ্বিতীয় স্ত্রী রিয়ার রুমে প্রবেশ করে এবং পরদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অবস্থান করে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুভ তার দ্বিতীয় স্ত্রী ও বাচ্চার সামনেই গভীর রাতে ওই ঘরে বসে মরণনেশা ইয়াবা সেবন করে এবং মাদকাসক্ত অবস্থায় বাড়ির নারীদের ওপর মানসিক নির্যাতন ও হেনস্তা চালায়। উপরন্তু, তুচ্ছ অজুহাতে ভুক্তভোগী পরিবারের মাটির চুলায় রান্না করা নিয়ে "এলাকার পরিবেশ নষ্ট হয়" বলে বিভিন্ন কটু মন্তব্য করে আসছে শুভ।

পুরোনো মাদক কারবারি, ডিবি পুলিশে আটক ও ইয়াবা ব্যবসার চাঞ্চল্যকর গুঞ্জন: এলাকাবাসীর তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা যায়, তারাবো ভূঁইয়াপাড়া এলাকায় শুভর বাসা এবং দীর্ঘদিন ধরে সে ইয়াবা ব্যবসার (মাদক কারবার) সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বলে তীব্র গুঞ্জন রয়েছে। শুভর মাদকের অপরাধের রেকর্ড আজকের নয়; আজ থেকে প্রায় ১০/১৫ বছর পূর্বে মরণনেশা মাদকসহ শুভ ও তার সহযোগীকে হাতেনাতে আটক করেছিল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সে সময় তাকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে শুভর বাবা তৎকালীন সময়ে মোটা অংকের (প্রায় ২ লক্ষ) টাকা খরচ করে রাতেই ডিবি কার্যালয় থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনেন বলে জানা গেছে।

খোলস বদল, হত্যা মামলার ৮ নং আসামি ও শ্বশুরবাড়ির রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার: শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র এসএসসি পাস হলেও এলাকায় প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে নিজেকে 'সাংবাদিক' হিসেবে ভুয়া পরিচয় দেয় শুভ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সে তার বাবার প্রভাবে এলাকায় দাপট দেখিয়ে চলত। গত ৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর এলাকা সূত্রে জানা যায়, ৫ই আগস্টে সাইনবোর্ড এলাকায় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় নারায়ণগঞ্জ কোর্টে শুভর নাম ৮ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রায় ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা দিয়ে বিষয়টি রফাদফা করে মামলা থেকে নিজের নাম কাটায় সে।

বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসায় শুভ তার প্রথম স্ত্রীর বাবার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় নতুন করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চাচ্ছে। শুভর প্রথম শ্বশুর নরসিংদী জেলার মাধবদী থানার মহিষাসুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে বর্তমানে শুভ নিজেকে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের আত্মীয় দাবি করে এলাকায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে এবং প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে পরোয়া করছে না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

২য় স্ত্রীর সতর্কবার্তা ও সপরিবারে গুলি করার হুমকি: সর্বশেষ গত ০৮ই জুন রাত আনুমানিক ৮:০০ ঘটিকার সময় বিবাদী শুভ অতর্কিতে তাদের হাজেরা নগরস্থ বাসভবনে অনাধিকার প্রবেশ করে এবং মাটির চুলার রান্নাঘরটি মোটরবাইক দিয়ে ধাক্কা মেরে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। এ সময় বাড়ির নারীদের শুভ অত্যন্ত অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে মারমুখী হয়ে তেড়ে আসে। ভুক্তভোগীরা জানান, শুভর দ্বিতীয় স্ত্রী রিয়া নিজে ই ইতিপূর্বে তাদের সতর্ক করে বলেছিল যে শুভ আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা তাদের পরিবারের সকলকে গুলি করে হত্যা করবে।

স্ত্রীর দেওয়া সেই সতর্কবার্তার সত্যতা মিলিয়ে গতকাল রাতে শুভ নিজেই প্রকাশ্য দিবালোকে ভোরের কাগজের সাংবাদিক মাহফুজ খানের পুরো পরিবারকে সপরিবারে গুলি করে হত্যার ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে দম্ভোক্তি প্রকাশ করে বলে, তার বিরুদ্ধে অলরেডি ৪/৫টি ক্রিমিনাল মামলা রয়েছে এবং তারাবো এলাকায় তার ক্ষতি করার ক্ষমতা কারও নেই। একই সাথে থানা-পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার অভ্যাস তার দীর্ঘদিনের বলে হুমকি দেয়।

এই বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এম সালাউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, একজন গণমাধ্যমকর্মীর পরিবারের ওপর হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৪৬৩) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তভার দেওয়া হয়েছে এসআই মোঃ মহিনুর ইসলামকে।

Link copied!