ভেতর থেকে দেখা বান্দরবান জেলা কারাগার

মোঃ হাসান , বান্দরবান, জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম

বাংলাদেশের মানুষের কাছে কারাগার মানেই কঠোরতা, কষ্ট আর অনিয়মের এক অন্ধকার চিত্র। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারণাকে নীরবে বদলে দিচ্ছে বান্দরবান জেলা কারাগার। সরেজমিনে ঘুরে এবং বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা—যেখানে শাস্তির পাশাপাশি রয়েছে শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং স্বচ্ছতার সমন্বয়।

কারাগারের ভেতরে প্রতিটি কার্যক্রম চলে নির্দিষ্ট সময়সূচি ও নিয়মের মধ্যে। ভোরে ইসলাম ধর্মাবলম্বী বন্দিরা নামাজ আদায়ের মাধ্যমে দিন শুরু করেন। এরপর সকাল ছয়টা থেকে শুরু হয় সকালের নাস্তা—রুটি-সবজি অথবা খিচুড়ি পরিবেশন করা হয় নিয়মিতভাবে। দুপুর ও রাতে দুই বেলা ভাত দেওয়া হয়। দুপুরে ভাত, ডাল ও সবজি, আর রাতে ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও এক পিস ভাজা মাছ পরিবেশন করা হয়। বন্দিদের পুষ্টির কথা বিবেচনায় রেখে প্রতিদিন আমিষের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। খাবারের মান সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বন্দিরা।

বর্তমানে বান্দরবান কারাগারে প্রায় সাড়ে ৩৫০-এর বেশি কয়েদি ও হাজতি বন্দি রয়েছেন। তবে সংখ্যার তুলনায় ব্যবস্থাপনায় কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম চোখে পড়েনি। বন্দিদের ভাষায়—"সবকিছু নিয়ম মেনেই চলে।" কারাবন্দিদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। প্রতি সপ্তাহে একবার পরিবারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতি ১৫ দিনে একবার আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কারা ফটকে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়—যা তাদের মানসিকভাবে অনেকটা স্বস্তি দেয়। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বন্দিদের খেলাধুলার সুযোগ রয়েছে। ভলিবল, মিনি ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিয়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকেন। কারাগারের ভেতরে একটি ক্যান্টিন রয়েছে, যেখান থেকে বন্দিরা চা, বিস্কুটসহ হালকা নাস্তা সংগ্রহ করতে পারেন। স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও রয়েছে বিশেষ নজর। অসুস্থ বন্দিদের জন্য একজন চিকিৎসক নিয়মিত চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এখানে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য। বন্দিদের মধ্যে যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, নিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা নেই। এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। কারাগারের এই ইতিবাচক পরিবেশের পেছনে বর্তমান জেলার নাছির আহমেদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বন্দিদের ভাষায়, তিনি নিয়মের ব্যাপারে কঠোর, তবে আচরণে অত্যন্ত মানবিক। কোনো অনিয়মকে তিনি প্রশ্রয় দেন না এবং বন্দিদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ করেন। ফলে কারারক্ষীরাও শৃঙ্খলার বাইরে যেতে পারেন না।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার নাছির আহমেদ বলেন, "এখানে আমাদের মূল লক্ষ্য শাস্তি নয়, বরং শৃঙ্খলা ও মানবিকতার মাধ্যমে বন্দিদের সংশোধন করা। সবাইকে সমান নিয়মের মধ্যে রাখা হয়, কোনো ধরনের বৈষম্য নেই। বন্দিদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য খেলাধুলা, চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা চাই, একজন বন্দি এখান থেকে বের হয়ে নতুনভাবে সমাজে ফিরে যাক।"

Advertisement

Link copied!