কালিয়াকৈরে বনাঞ্চলে অবৈধ সীসা কারখানা: পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে ভয়াবহ হুমকি

তুষার আহম্মেদ , কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বনাঞ্চলের ভেতরে একাধিক অবৈধ কারখানায় পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে। এসব কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক বর্জ্যে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার জাথালিয়া, মজিদচালা ও মৌচাক ইউনিয়নের কাচারস এলাকার শালবন ও সামাজিক বনায়নের ভেতরে গড়ে ওঠা দুটি নামবিহীন কারখানায় কয়লার মাধ্যমে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন করা হচ্ছে। কারখানা থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়া ও তীব্র দুর্গন্ধ আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের মজিদচালা এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে একটি কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। বনাঞ্চলের নির্জন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে নজরদারির অভাব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বছরের বিভিন্ন সময়ে ওই কারখানায় ব্যবহৃত টায়ার পুড়িয়ে ব্ল্যাক অয়েল ও মবিল তৈরির পাশাপাশি ব্যাটারি গলিয়ে সীসা উৎপাদন করা হয়।

এদিকে, মৌচাক ইউনিয়নের কাচারস এলাকায় সালাম সরকার নামে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে আরেকটি অবৈধ সীসা কারখানা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে ব্যাটারি পোড়ানো হয়। ফলে চারপাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছের পাতা ও ঘরের টিনের চালে কয়লার মতো কালো পদার্থ জমতে দেখা যায়। তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও সালাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, "দিনভর কাজের পর রাতে বাসায় ফিরে দুর্গন্ধের কারণে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও পোড়া ব্যাটারির গন্ধ শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে।"

বাশতলী গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন বলেন, "সন্ধ্যার পর থেকেই কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ঢেকে যায়। দুর্গন্ধে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী কয়েকবার প্রতিবাদ করলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো গুরুত্ব দেয়নি।"

জাথালিয়া গ্রামের বাসিন্দা জহিরুল হক জানান, "রাতের বেলায় বিভিন্ন যানবাহনে করে মালামাল আনা-নেওয়া করা হয়। কারখানার চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছে। সকালে ঘরের চাল ও আশপাশে কালো ধুলার স্তর জমে থাকতে দেখা যায়। পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।"

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য মোতালেব মিয়া বলেন, "একসময় এ অঞ্চলের মানুষ নির্মল পরিবেশে বসবাস করত। এখন অবৈধ এসব কারখানা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে কারখানাগুলো বন্ধ করা জরুরি।"

এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, "ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদনের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। বিশেষ করে বনাঞ্চল বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

Link copied!