ভয়াবহ দাবদাহে ফ্রান্সে মৃত্যু অর্ধশত, স্থবির জনজীবন

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

ইউরোপের দেশ ফ্রান্স ভয়াবহ দাবদাহের কবলে পড়ে নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তীব্র গরমে হিট স্ট্রোক ও তাপজনিত নানা অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানির সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

শীতপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সে এ ধরনের অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবেই দেশটি এমন ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে এবং কোথাও কোথাও তা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে। পাশাপাশি সড়কে নিয়মিত পানি ছিটানো এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার জাতীয় তাপমাত্রা সূচক ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ১৯৪৫ সালের পর সর্বোচ্চ। চারটি বিভাগে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি প্রভাবের মধ্যে পড়েছেন। আরও ৩১টি বিভাগ উচ্চমাত্রার সতর্কতার আওতায় রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই চরম আবহাওয়ার প্রভাবে আক্রান্ত।

দাবদাহের কারণে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের ফিনিস্তের এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিকল হয়ে পড়ায় প্রায় ৬৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে। শিশু ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অক্সিতানি ও নুভেল-আকিতেন অঞ্চল। কোরেজের ব্রিভ এলাকায় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বোর্দো শহরে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানী প্যারিস, ইল-দ্য-ফ্রান্স এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

দাবদাহের প্রভাব শুধু দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সোমবার ও মঙ্গলবার রাতে দেশের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ রাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় রাতের তাপমাত্রাও ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি, ফলে মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে না।

তীব্র গরমে সকাল গড়াতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। দুপুরের পর খোলা আকাশের নিচে শ্রমনির্ভর কাজ সীমিত বা বন্ধ রাখার নির্দেশনার কারণে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পর্যটন শিল্পেও। দেশের জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার আশঙ্কা। প্রায় ৫০টি অঞ্চলে এ ধরনের বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে।

Link copied!