তিস্তা পানিবণ্টন বিরোধ: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক অমীমাংসিত অধ্যায়

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম

তিস্তা ভারতের সিকিম রাজ্যের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার কালিগঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করেছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩০৫ কিলোমিটার ভারতের মধ্যে এবং ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত। ভারতের প্রায় ৯ লাখ ২২ হাজার হেক্টর ও বাংলাদেশের ৭ লাখ ৫০ হাজার জমি সেচের জন্য তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল। তিস্তা নদীর অববাহিকায় প্রায় ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) মানুষ বসবাস করে। এর মধ্যে প্রায় ৭১% মানুষ উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে বাস করে। বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ নদীর উপর নির্ভরশীল। তিস্তা নদীর বার্ষিক পানিপ্রবাহ প্রায় ৬০ বিলিয়ন কিউসেক মিটার। তবে, এর ৯০% বর্ষাকালে প্রবাহিত হয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। ভারতের গজলডোবা ব্যারাজে প্রয়োজনীয় ১ হাজার ৬০০ কিউসেকের পরিবর্তে কখনও মাত্র ১০০ কিউসেক পানি পাওয়া যায়। এর ফলে বাংলাদেশে খরার প্রকোপ দেখা দেয়। আবার বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বেশি হওয়ায় গজলডোবা ব্যারেজ খুলে দেয়, যার ফলে বন্যা হয় উত্তরাঞ্চলে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৮৩ সালে একটি অস্থায়ী পানিবণ্টন সমঝোতা হয়, যেখানে ভারত ৩৯%, বাংলাদেশ ৩৬% এবং অবশিষ্ট ২৫% পানি অনির্ধারিত রাখা হয়। তবে এটি স্থায়ী সমাধান ছিলো না। পরবর্তীতে ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তি তৈরি হয়েছিল, যেখানে ভারত ৪২.৫% এবং বাংলাদেশ ৩৭.৫% পানি পাওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর থেকে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করছে ভারত। এমনকি নদীর বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন না মেনে ২০২৩ সালে উজানে আরও দুটি খাল খননের উদ্যোগ নেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ফলে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ থেকে বাঁচতেই বাংলাদেশ তিস্তা মহাপরিকল্পনা তৈরি করে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে, ভারতের সঙ্গে স্থগিত পানিবণ্টন আলোচনা এ প্রকল্পে ভূরাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে।

২০২১ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে ভারতের সাথে ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সে সময় গঙ্গা চুক্তি নবায়নের কথা যেমন উঠেছিল, তিস্তা নদীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায়ও ভারত যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও দিল্লিতে চিঠি লিখে তিস্তার পানিবণ্টন বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলেছিলেন—তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ইস্যুতে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এই ইস্যুতে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও আইনের দ্বারস্থ হতে পারে। বর্তমানে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সমীকরণ এক হওয়ায় তাত্ত্বিকভাবে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের পথ সুগম হওয়ার কথা থাকলেও এর বাস্তবায়ন এখনও বেশ জটিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে এই চুক্তি ঝুলে ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলে সেই বাধা কিছুটা কমলেও নতুন ভিন্ন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত হত্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। এসব কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়ন আরও জটিল হচ্ছে।

তিস্তা চুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে মূল বাধাগুলো হলো—প্রথমত, ভারতের ফেডারেল কাঠামো ও অনিচ্ছা। দ্বিতীয়ত, পানির প্রকৃত প্রাপ্যতার অভাব। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ কমে যায়, ফলে কীভাবে ভাগ করা হবে এটাই বড় প্রশ্ন। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি—বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই পানি ইস্যু একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়। কোনো সরকারই এমন সিদ্ধান্ত নিতে চায় না যা দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনার কারণ হতে পারে। চতুর্থত—জলবায়ু পরিবর্তন—হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি তিস্তা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাহলে আশার জায়গা কোথায়? যদি বাংলাদেশ ও ভারতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়, নদীর প্রবাহ নিয়ে যৌথ তথ্য ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে আলোচনা হয়, উভয় দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের সমন্বয় ঘটাতে পারলে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বিরোধ তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা আগের তুলনায় বাড়তে পারে।

তাছাড়া, দীর্ঘদিন তিস্তা চুক্তি আটকে থাকায় বাংলাদেশ সরকার চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে ঝুঁকলেও বর্তমান সরকার ঋণের উপর নির্ভর করতে চায় না। তাই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি এবং প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদসহ একটি প্রতিনিধি দল তিস্তা ব্যারেজ এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ জুন ২০২৬ চীন সফরে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লিও গুয়িংয়ের সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা ও পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ চলমান নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। জবাবে লি গুয়িং বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। রংপুর বিভাগ জাতীয় কৃষি উৎপাদনে প্রায় ২২-২৫% খাদ্যের জোগান দিয়ে থাকে। এছাড়াও উত্তর অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য তিস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, ভারত যদি বাংলাদেশের সাথে স্থায়ী কোনো চুক্তি না করে, তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নই হতে পারে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

তবে, তিস্তার জলবণ্টন বিরোধ শুধু একটি নদীর পানি ভাগাভাগির প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার আস্থা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই শক্তিশালী করবে না বরং দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সফল দৃষ্টান্তও স্থাপন করবে। তাই, তিস্তার টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান আজ সময়ের দাবি।

লেখক: রাবেয়া বসরি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Link copied!