শুরুর একাদশে ছিলেন না লিওনেল মেসি। তবু খেলার নিয়ন্ত্রণ কিংবা ছন্দ—কোনোটিতেই ভাটা পড়েনি আর্জেন্টিনার। প্রথমার্ধেই জিওভানি লো সেলসো ও লাউতারো মার্তিনেসের গোলে শক্ত ভিত গড়ে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দ্বিতীয়ার্ধে জর্ডান একবার ব্যবধান কমিয়ে প্রত্যাবর্তনের আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত সব আলো কেড়ে নেন মেসি।
বদলি হিসেবে মাঠে নেমে মুক্ত আঘাত থেকে অসাধারণ গোল করে বিশ্বকাপে গড়েন নতুন রেকর্ড। তাঁর গোলেই ৩–১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে পূর্ণ নয় পয়েন্ট নিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে আর্জেন্টিনা।
গ্রুপ ‘জে’-এর শেষ খেলায় আর্জেন্টিনার হয়ে একটি করে গোল করেন লো সেলসো, লাউতারো মার্তিনেস ও মেসি। জর্ডানের একমাত্র গোলটি করেন মুসা আল তামারি।
তিনটি খেলার সবকটিতেই জয় তুলে নিয়ে নয় পয়েন্টে গ্রুপসেরা হয়েছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে অভিষেক বিশ্বকাপে জর্ডান কোনো পয়েন্ট না পেলেও তিনটি খেলাতেই গোল করে নিজেদের লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
খেলার শুরু থেকেই বলের দখল ছিল আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে। গাঢ় নীল জার্সিতে নামা বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা মেপে খেললেও আক্রমণে ছিল ধার। জর্ডানও নিজেদের গুটিয়ে নেয়নি; শুরুতে আক্রমণাত্মক চাপ সৃষ্টি করে কিছুটা অস্বস্তিতেই রেখেছিল আর্জেন্টিনাকে।
অষ্টম মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসের পাস থেকে বল জালে জড়িয়েছিলেন লো সেলসো। কিন্তু সহকারী রেফারির পতাকা ওঠায় সেটি বাতিল হয়।
১৩তম মিনিটে কর্নার থেকে সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি নিকোলাস ওতামেন্দি। জুলিয়ানো সিমিওনের আক্রমণ থেকে পাওয়া কর্নারে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া শিরোনিক্ষেপ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
১৯তম মিনিটে জর্ডানের রক্ষণভাগ ভেঙে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। দণ্ডক্ষেত্রের বাইরে পাওয়া মুক্ত আঘাত থেকে গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে চমৎকার শটে বল জালে পাঠান লো সেলসো। ফাউলের সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও রেফারি নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি বিরতির পরও আক্রমণের ধার বজায় রাখে আর্জেন্টিনা। ২৯তম মিনিটে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর পাস থেকে লাউতারোর শট আড়াআড়ি দণ্ডে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে মার্কোস সেনেসির প্রচেষ্টাও দণ্ডে লাগে। ওই আক্রমণের সময় সেনেসির মাথায় প্রতিপক্ষের পা লাগলে চিত্রসহকারী রেফারির সহায়তায় দণ্ডাঘাতের সিদ্ধান্ত দেন ম্যাচ পরিচালনাকারী।
৩১তম মিনিটে দণ্ডাঘাত থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লাউতারো। গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে নিচু শটে বল জালে জড়ান তিনি।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি জর্ডান। আলি ওলওয়ান কয়েকবার আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ছিল দৃঢ়। বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রেখে প্রথমার্ধ শেষ করে লিওনেল স্কালোনির দল।
বিরতির পর দুটি পরিবর্তন আনে জর্ডান। আলি আল আজাইজেহ ও ওদেহ ফাখোরির জায়গায় মাঠে নামেন মুসা আল তামারি ও মাহমুদ আল মারদি। বদল আনার ফলও দ্রুত পাওয়া যায়।
৪৯তম মিনিটে দ্বিতীয়বারের মতো বল জালে পাঠান লো সেলসো। কিন্তু আক্রমণের শুরুতেই লাউতারো এগিয়ে থাকায় সেই গোলও বাতিল হয়।
৫৪তম মিনিটে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন লাউতারো। লো সেলসোর পাস থেকে তাঁর জোরালো শট আবারও আড়াআড়ি দণ্ডে লেগে বাইরে চলে যায়।
এর দুই মিনিট পরই খেলায় ফিরে আসে জর্ডান। নিজেদের মধ্যে চমৎকার ছোট ছোট পাসে আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে ডান দিক থেকে এহসান হাদ্দাদের বাড়ানো বল পেয়ে দারুণ দক্ষতায় গোল করেন মুসা আল তামারি।
গোল হজমের পর কিছু সময় আর্জেন্টিনার খেলার গতি কমে যায়। ৬১তম মিনিটে লো সেলসো ও লাউতারোকে তুলে মাঠে নামানো হয় থিয়াগো আলমাদা ও লিওনেল মেসিকে। একই সময়ে নিকো পাসের জায়গায় নামেন আলেক্সিস মাক আলিস্তার।
মেসি মাঠে নামার পরও অযথা তাড়াহুড়ো করেনি আর্জেন্টিনা। বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই তারা খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। ৬৬তম মিনিটে মাক আলিস্তারকে ফাউল করায় ভালো জায়গায় মুক্ত আঘাত পেলেও মেসির প্রথম প্রচেষ্টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
তবে ৮০তম মিনিটে আর ভুল করেননি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। নিজেই ফাউল আদায় করে পাওয়া মুক্ত আঘাত থেকে নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান তিনি। ক্যারিয়ারে আরও অনেক দৃষ্টিনন্দন গোল থাকলেও এই গোল তাঁকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। বিশ্বকাপে টানা সাতটি খেলায় গোল করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েন মেসি। প্রায় ঊনচল্লিশ বছর বয়সেও বিশ্বমঞ্চে তাঁর গোল করার তৃষ্ণা যে একটুও কমেনি, সেটিই যেন আবারও প্রমাণ হলো।
শেষ দিকে আর্জেন্টিনা আরও দুটি পরিবর্তন আনে। হুলিয়ান আলভারেসের জায়গায় নামেন হোসে মানুয়েল লোপেস। এর আগে জুলিয়ানো সিমিওনের পরিবর্তে মাঠে এসেছিলেন ভালেন্তিন বারকো।
শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত মেসির কর্নার ও মুক্ত আঘাত থেকে কয়েকবার বিপদে পড়ে জর্ডান। তবে আর কোনো গোল হয়নি। যোগ করা সময়ের আগে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন জর্ডানের হাসান আবুদাহাব। তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সময়ে আলি ওলওয়ানের পরিবর্তে নামেন সালিম ওবাইদ ও মোহাম্মদ আবু জরায়েক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ব্যবধান কমাতে পারেনি জর্ডান। ৩–১ গোলের জয় নিয়েই গ্রুপপর্ব শেষ করে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
আপনার মতামত লিখুন :