এক সময় বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, মেয়ে বড় হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাবা ও মাকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত ঐশী রহমানের জীবন এখন সীমাবদ্ধ কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাঠাগারের দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট কারা সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৯ বছর বয়সে কারাজীবন শুরু হয় ঐশীর। প্রচলিত আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন দণ্ডের মেয়াদ ৩০ বছর হিসেবে গণ্য হওয়ায় ইতোমধ্যে তিনি প্রায় ১৩ বছর কারাভোগ করেছেন। একই হিসেবে আরও প্রায় ১৭ বছর কারাগারে থাকতে হবে। তবে বন্দিজীবনে শৃঙ্খলা বজায় রাখলে সরকারের বিবেচনায় দণ্ডের কিছু অংশ মওকুফের সুযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকার চামেলীবাগের বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের ভাই পল্টন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই দিন ঐশী থানায় আত্মসমর্পণ করে বাবা-মাকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করে, হত্যাকাণ্ডটি ঐশী একাই ঘটিয়েছেন। তাঁর দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে হত্যায় প্ররোচনা ও পরে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। বাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে লাশ গোপনে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর নিম্ন আদালত ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে উচ্চ আদালত মামলার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে ২০১৭ সালের ৫ জুন মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করেন। সেই থেকে তিনি কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারেই রয়েছেন।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও গণসংযোগ) জান্নাত-উল-ফরহাদ জানিয়েছেন, ঐশী বর্তমানে মহিলা ওয়ার্ডে অবস্থান করছেন এবং কারাগারের পাঠাগারের দায়িত্ব পালন করছেন।
মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর প্রায় দেড় বছর তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে ছিলেন। পরে সাজা পরিবর্তনের পর তাঁকে সাধারণ মহিলা ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
বর্তমানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তিনি পাঠাগারে দায়িত্ব পালন করেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত দুই পর্বে বই নিবন্ধন ও পাঠাগার পরিচালনার কাজ করেন। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় অবসরে তিনি ইংরেজি গল্প ও উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন। কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর আচরণ শান্ত ও সংযত, তবে তিনি খুব কম কথা বলেন। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায়ও তিনি ভুগছেন।
কারাগারে ফুলের বাগানের পরিচর্যাতেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন ফুলের বাগানে সময় কাটান এবং গাছের পরিচর্যা করেন। এটি তাঁর দায়িত্বের অংশ না হলেও ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই তিনি কাজটি করেন।
কারা সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে একই কারাগারে থাকায় পাঠাগারের দায়িত্বও তাঁর কাছেই রয়েছে। মাঝেমধ্যে নানার পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেও পিতৃপরিবারের কেউ সাধারণত সাক্ষাতে আসেন না।
উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড উপযুক্ত হলেও কয়েকটি বিশেষ বিষয় বিবেচনায় সাজা লঘু করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ঘটনার সময় ঐশী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি পরিবারে মানসিক অসুস্থতার পূর্ব ইতিহাসের কথাও উঠে আসে।
রায়ে আরও বলা হয়, ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর, পূর্বে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের নজির ছিল না এবং ঘটনার পর তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পাশাপাশি আদালত মন্তব্য করেন, কর্মব্যস্ততার কারণে বাবা-মা সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেননি। সন্তানকে সময় দেওয়া এবং সঠিক পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব অভিভাবকদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
আপনার মতামত লিখুন :