বাবার একাধিক বিয়ের প্রতিবাদ করায় আমতলীতে বাবার নেতৃত্বে ছেলে খুন

মিথুন কর্মকার , আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম

বাবার একাধিক বিয়ের প্রতিবাদ করায় আমতলীতে বাবা মিজানুর ওরফে ভুট্টো কাজীর নেতৃত্বে আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়ন শ্রমিকদল সভাপতি ছেলে রিপন কাজীকে (৩৫) খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাইয়ের ছেলে গুলিশাখালী ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি রিফাত কাজী ও তার সহযোগীরা তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালী সদর উপজেলার গগণখা এলাকার ফারুক ডাক্তারের বাড়ির সামনে মঙ্গলবার রাত পৌনে বারোটার দিকে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মোস্তফা কাজী ও ফিরোজ কাজী নামের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিহতের বাড়ি আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কালীবাড়ি গ্রামে।

জানা গেছে, আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কাজীবাড়ি গ্রামের মো. মিজানুর ওরফে ভুট্টো কাজীর ছেলে ইউনিয়ন শ্রমিকদল সভাপতি রিপন কাজী। বাবা মিজানুর রহমান কাজী একাধিক বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ চলে আসছিল। ওই বিরোধের জের ধরে ছেলে রিপন কাজী গত দুই বছর আগে বাবাকে পিটিয়ে তার পা ভেঙে দেন। এর প্রতিশোধ নিতে বাবা মিজানুর কাজী গত ফেব্রুয়ারি মাসে ছেলেকে মারধর করেন। কিন্তু তাতেও প্রতিশোধের নেশা কাটেনি বাবা মিজানুর কাজীর। বাবা ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

এদিকে, ঢাকা বিমানবন্দরে কর্মরত সজিব কাজীর ছোট ভাই গুলিশাখালী ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি মো. রিফাত কাজী ও ইউনিয়ন শ্রমিকদল সভাপতি রিপন কাজীর মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই আধিপত্য নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুজনের মধ্যে চরম বিরোধ চলে আসছে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে বাবা মিজানুর কাজী, ভাইয়ের ছেলে সজিব কাজী, ছাত্রদল সভাপতি রিফাত কাজী ও তার সহযোগী রাসেল কাজী, রাহাত কাজী, সোহাগ কাজী ও মনির কাজীকে নিয়ে ছেলে রিপন কাজীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন এমন অভিযোগ নিহতের ভাই সাব্বির কাজীর।

মঙ্গলবার রাত সোয়া এগারোটার দিকে রিপন কাজী ও তার চাচাতো ভাই রাজিব কাজী বাজারঘোনা এলাকা থেকে মোটরসাইকেলে গ্রামের বাড়ি কালীবাড়ি যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে পটুয়াখালী সদর উপজেলার গগণখা এলাকার ফারুক ডাক্তারের বাড়ির সামনে ওঁত পেতে থাকা বাবা মিজানুর কাজী, ভাইয়ের ছেলে রিফাত কাজী, রাসেল কাজী, সোহাগ কাজী ও মনির কাজীসহ ১৫-২০ জন সন্ত্রাসী তাদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। এ সময় রাসেল কাজী চাচাতো ভাই রিপন কাজীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে মোটরসাইকেলসহ রিপন কাজী ও তার আরেক চাচাতো ভাই রাজিব কাজী সড়কে লুটিয়ে পড়েন। সন্ত্রাসীরা রিপন কাজীকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী সাথে থাকা রাজিব কাজী। স্থানীয়দের সহযোগিতায় রাজিব কাজী গুরুতর আহত রিপন কাজীকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ওই হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খবর পেয়ে আমতলী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তারা নিহতের বাবা মিজানুর কাজীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে। ওই ঘটনার পর থেকে বাবাসহ সন্ত্রাসীরা পালিয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মোস্তফা কাজী ও ফিরোজ কাজী নামক দুজনকে পালানোর সময় আটক করে আমতলী থানা পুলিশে সোপর্দ করেছে। পুলিশ তাদের পটুয়াখালী সদর থানায় হস্তান্তর করেছে। তাদের ওই থানায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানান ওসি মো. মনিরুজ্জামান।

বাবার নেতৃত্বে ছেলেকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে বাবা ও সন্ত্রাসীরা পালিয়েছে। এ ঘটনায় পটুয়াখালী সদর থানায় মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিহতের মরদেহ পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী রাজিব কাজী বলেন, "আমি আর রিপন কাজী রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বাজারঘোনা থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে গগণখা নামক স্থানে পৌঁছামাত্রই রাসেল কাজী চাচাতো ভাই রিপন কাজীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে মোটরসাইকেলসহ আমরা সড়কে লুটিয়ে পড়ি। আমি দৌড়ে খালে পড়লেও রিপন কাজীকে রিফাত কাজী, রাসেল কাজী, রাহাত কাজী, সোহাগ কাজী ও মনির কাজীসহ ১৫-২০ জন কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন।"

নিহত রিপন কাজীর ছোট ভাই সাব্বির কাজী বলেন, "আমার বাবা মিজানুর কাজী একাধিক বিয়ে করেছেন। ভাই রিপন কাজী এর প্রতিবাদ করলে তার সঙ্গে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। অপরদিকে আমার চাচাতো ভাই ঢাকা বিমানবন্দরে চাকরিরত সজিব কাজীর পরিকল্পনায় বাবার নেতৃত্বে ও চাচাতো ভাই রিফাত কাজী ও তার সহযোগীরা আমার ভাইকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।"

মা আমেনা বেগম কান্নাজনিত কণ্ঠে বলেন, "আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের কঠোর বিচার চাই।"

আমতলী থানার ওসি মো. ইয়াকুব হোসাইন বলেন, "এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় জনতা দুজনকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে। তাদের পটুয়াখালী থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা দুজন পটুয়াখালী পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। ওই মোবাইল নিহত রিপন কাজীর বাবা মিজানুর কাজীর। ঘটনাস্থল পটুয়াখালী হওয়ায় তারাই আইনি ব্যবস্থা নিবেন।"

পটুয়াখালী সদর থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, "দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

Advertisement

Link copied!