বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলার পাহাড়ি বনাঞ্চলে অবৈধভাবে বাঁশ ও গাছপালা উজাড়ের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে ‘বাঁশবাগান পাহাড়’ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বাঁশঝাড় নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে, যা স্থানীয় বুনো হাতির অন্যতম প্রধান খাদ্য উৎস হিসেবে পরিচিত। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রজনন মৌসুমেও কোনো ধরনের বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে বাঁশ ও অপরিপক্ক গাছ কেটে বনকে প্রায় খালি করে দিচ্ছে। এতে শুধু আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে ডলুছড়ি রেঞ্জে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রাকৃতিক বাঁশঝাড় উজাড় করে সেখানে বাণিজ্যিক বনজ গাছ রোপণের পরিকল্পনা করছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। এ বিষয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর কোনো অভিযান বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতিতেই এ বন নিধন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁশ বুনো হাতির প্রধান খাদ্য। এই প্রাকৃতিক খাদ্য উৎস ধ্বংস হয়ে গেলে হাতির দল বাধ্য হয়ে লোকালয় ও কৃষিজমিতে প্রবেশ করবে। এতে বাড়বে মানুষ–হাতি সংঘাত, যা ইতোমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে একটি গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে। খাদ্যের অভাবে হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলে যেমন মানুষের জীবন ও ফসলের ক্ষতি হয়, তেমনি ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিরোধ বা বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারায় বিরল এই প্রাণী। ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসনের চোখের সামনে কীভাবে দিনের পর দিন একটি বিশাল বনাঞ্চল এমনভাবে উজাড় কার্যক্রম চলতে পারে? সংবাদ প্রকাশের পর বন বিভাগ অভিযান পরিচালনা করবেন বলে জানালেও, বাস্তবে তেমন অভিযান চোখে পড়ে না। এ বিষয়ে ডলুছড়ি রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার এ.কে.এম. আলতাফ হোসেন ও বিট কর্মকর্তা করিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাঁশ কাটার কোনো তথ্য বা ছবি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত বন রক্ষায় মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। সরকার ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন :