‘১৭ বছর বঞ্চিত’ তদবিরে বিরক্ত আইজিপি

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৫ এএম

‘১৭ বছর বঞ্চিত’ তদবিরে বিরক্ত আইজিপি

ফাইল ফটো

বর্তমানে অনেক পুলিশ সদস্য গত ১৭ বছর ধরে ‘বঞ্চিত’ ছিলেন বলে দাবি করছেন। তারা তদবির নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন বিভিন্ন দপ্তরে। বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।

আইজিপি এসব পুলিশ সদস্যের উদ্দেশ্যে বলেন, তদবির করে ভালো কোথাও পোস্টিং পাওয়া যায় না। মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রমাণ করতে হবে। অনৈতিক লেনদেন থেকে বিরত থাকতেও নির্দেশনা দেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে আইজিপি এমন মন্তব্য করেন।

পুলিশ সদ্যসদের উদ্দেশ্যে আইজিপি বলেন, আপনারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে দেশের স্বার্থে ও জনগণের শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। তবে ইচ্ছাকৃত ভুল বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে তার দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। সেক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সভায় উপস্থিত ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানান।

পুলিশে তদবিরের বিষয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রসঙ্গে ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, তদবির করে কোনো পদ বা দায়িত্ব পেলেও সেখানে সক্ষমতা প্রমাণ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত তদবিরকারীরাই বিব্রত হন। তাই তদবিরের পরিবর্তে নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থানে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার ও ভুল প্রচার

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ভুল প্রচারের বিষয়টিও উঠে আসে সভায়। পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে একটি বিশেষ শ্রেণি অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।

এ ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে পুলিশ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্টের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। জনগণ একদিকে যেমন জনগণবান্ধব ও শক্তিশালী পুলিশ চায়, অন্যদিকে পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখতে চায় না। পুলিশকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে- এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে।

ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের দায় বাহিনী নেবে না

আইজিপি বলেন, রাজধানীতে দেশি-বিদেশি কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের মানুষ বসবাস করেন, তাই রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুরো দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই অপরিহার্য। মাঠপর্যায়ের কাজ গতিশীল করতে সিনিয়র অফিসারদের সরাসরি মনিটরিং বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক তদারকি থাকলে নিচের স্তরের পুলিশ সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হয়।

পুলিশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্রে সচেতন থাকার আহ্বান

রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে আইজিপি বলেন, দল-মত নির্বিশেষে পুলিশের পরিচয় একটাই- আমরা আইন ও জনগণের সেবক। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে। বর্তমানে ঐতিহ্যগত অপরাধের চেয়ে সাইবার ক্রাইম, গুজব এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার ও ‘মিস ইনফরমেশন’ মোকাবিলা করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পুলিশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

হোটেল ও স্পা সেন্টারের অবৈধ কর্মকাণ্ড যেন না হয়

হোটেল ও স্পা সেন্টারে কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলে সভায় ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।

ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিতের নির্দেশ

সভায় একাধিক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ডিএমপি কমিশনার ঢাকার ছিনতাই প্রতিরোধে ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সিটিটিসি ও ডিবিকে ২৪ ঘণ্টা মাঠে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অভিযান জোরদারের পাশাপাশি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।

প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও ক্রাইম বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন ও তদন্ত কার্যক্রম আরও কার্যকর এবং গতিশীল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যথাযথভাবে যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডিএমপি কমিশনার।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার।

থানার পাশে ঝোপঝাড়, পুকুরে অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে নির্দেশনা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে শুধু নিয়মিত অভিযান নয়, থানাগুলোর আশপাশের সম্ভাব্য স্থানগুলোতেও বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে থানার আশপাশের ঝোপঝাড়, পুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা বা ফেলে দেওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ পাওয়া যায় কি না সেগুলো ভালোভাবে খুঁজে দেখতে হবে।

কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের নির্দেশ

ঢাকায় বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে কিশোর গ্যাং গ্রুপ। এসব গ্রুপের সদস্যরা দিনে-দুপুরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতিসহ খুনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে বলেছেন কমিশনার। এছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়।

একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানা ও গোয়েন্দা ইউনিটগুলোকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, তাদের চলাফেরা ও অপরাধ কর্মকাণ্ডের ধরন পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Link copied!