চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহতের চার দিন পর মামলা হয়েছে। পুলিশ অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করে। সীতাকুণ্ড থানার ওসি মঈনুল হোসেন এই তথ্য জানিয়েছেন। গত (১৪ আগস্ট) সকালে একটি এলএনজি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে পানি অপসারণের সময় জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে ৯ শ্রমিক নিহত ও অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ট্র্যাজেডি প্রমাণ করেছে, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের নামে আন্তর্জাতিক গ্রিন সনদের অন্তরালে বস্তুত ‘গ্রিনওয়াশিং’ বা ভুয়া সুরক্ষার ফাঁদ তৈরি হয়েছে, যা শ্রমিকদের ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে ।
প্রাথমিক ধারণা, হাইড্রোজেন সালফাইড (এইচ₂এস) গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটনায় ফেরদৌস স্টিলের স্বত্বাধিকারী ও প্রধান কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। পাশাপাশি শিল্প, পরিবেশ ও শ্রম মন্ত্রণালয়সহ ১২টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনি ও আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এতে আগামী তিন দিনের মধ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে জবাব জানানোর আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
রোববার পাঠানো দুটি পৃথক নোটিশে বেলা উল্লেখ করে, হাইকোর্টের একাধিক রায় ও নির্দেশ অমান্য করেই ইয়ার্ডটিতে জাহাজ ভাঙার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল। এতে আরও বলা হয়, জাহাজভাঙা শিল্পে বিষাক্ত গ্যাস মুক্তকরণের (গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট) নিশ্চয়তা, কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আইনি নির্দেশনা থাকলেও তা তোয়াক্কা করা হয়নি।
২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই ইয়ার্ডে অন্তত পাঁচবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া দুর্ঘটনার প্রায় ছয় মাস আগে সরকারি পরিদর্শন সংস্থা ওই ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তার অভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং শ্রম আইনের নানা লঙ্ঘনের চিত্র শনাক্ত করেছিল। তা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদফতরের ৫২৯তম সভায় ‘এমটি রাসি’ কাটার ছাড়পত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। বেলার অভিযোগ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার চেয়ে জাহাজভাঙা শিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় মোট ১৪৯ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৩৯ জন। এর মধ্যে চলতি ২০২৬ সালেই নিহত হয়েছেন ১২ জন। সংগঠনটির সমন্বয়ক ফজলুর করিম মিন্টু জানান, কাগজে-কলমে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ তকমা দেওয়া হলেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা কমেনি। নিহতদের পরিবারকে নামমাত্র কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও কোনো ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে বিচার বা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। থানায় কার্যকর মামলা না হওয়ায় মালিকপক্ষ সর্বদা অধরাই থেকে যায়।
দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন শেষে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, জাহাজটিতে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঘটনা তদন্তে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে ৯ সদস্যের এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে বেলা এই তদন্ত কমিটিগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব লোকদের দিয়ে তদন্ত করালে ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হয়। তাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, বিএসবিআরএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, এ ধরনের ঘটনা কাঙ্ক্ষিত নয়। যারা আমাদের কাছে জাহাজ বিক্রি করে ‘ক্লাস এনকে’ (হংকং সার্টিফিকেট) দেয়, তাদের দেওয়া তথ্য বা রিপোর্ট ভুয়া কি না তা আমরা চ্যালেঞ্জ করব।তাছাড়া ১০ লাখ টাকা দিয়ে কোনো মানুষের জীবনের ক্ষতিপূরণ হয় না। তদন্তে কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আপনার মতামত লিখুন :