অস্ত্র-মাদক-ছিনতাইয়ে অশান্ত বালুখালী, জুলু ডাকাতের পরিবারকে ঘিরে সংঘবদ্ধ চক্রের অভিযোগ

মোহাম্মদ রাশেদ , কক্সবাজার জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ০২:২৪ পিএম

অস্ত্র-মাদক-ছিনতাইয়ে অশান্ত বালুখালী, জুলু ডাকাতের পরিবারকে ঘিরে সংঘবদ্ধ চক্রের অভিযোগ

ফাইল ফটো

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী এলাকায় অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কথিত এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন বালুখালীর আলোচিত আজিজুল হক প্রকাশ জুলু ডাকাতের পরিবারের সদস্যরা। তাদের মধ্যে নূরুল আমিন, বাবুল, জানে আলম, নূরুল সওদাগরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় বালুখালী খেলার মাঠসংলগ্ন কালভার্ট ও কবরস্থান এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে পথচারী ও ব্যবসায়ীদের টার্গেট করা হয়। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোবাইল, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া, মাদক পরিবহন এবং অপহরণের মতো অপরাধে চক্রটির সদস্যরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।  নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে বালুখালীতে অভিযান চালিয়ে নূরুল আমিনকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটকের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযানের বর্ণনা অনুযায়ী, তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের পর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়।

তল্লাশিতে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি একে-২২ রাইফেল, একটি দেশীয় পিস্তল, দুটি একনলা বন্দুক, দুটি ধারালো অস্ত্র, একটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, দুটি রাইফেলের ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৮৯ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, দুটি কার্তুজ, দুটি ওয়াকিটকি সেট এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। অভিযানের সময় নূরুল আমিনের সহযোগী হিসেবে জানে আলম ও সোহেলকে আটক করা হয়। এ সময় সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত বলে উল্লেখ করা রাসেল নামের এক ব্যক্তি বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান বলে অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে আটক তিনজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, নূরুল আমিন এর আগেও মাদকসহ আটক হয়ে কারাগারে ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে জামিনে বের হয়ে তিনি পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ৩ মার্চ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির-৯-এর সি/১৮ ব্লকসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি দেশীয় তৈরি এলজি, একটি বিদেশি পিস্তল ও নয় রাউন্ড গুলিসহ পাঁচ রোহিঙ্গাকে আটকের তথ্য জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানে নূরুল আমিনের বড় ভাই বাবুলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর বালুখালী এলাকায় মাদক ব্যবসার টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে গোলাগুলির একটি ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে জুবায়ের নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিক গুলিবিদ্ধ হন। পরে তিনি ন্যায়বিচার চাইতে উদ্যোগ নিলে তাকে মারধর করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে নূরুল আমিনের বিরুদ্ধে। 

অন্যদিকে জুলু ডাকাতের জামাতা হিসেবে পরিচিত নূরুল সওদাগরের বিরুদ্ধে শরণার্থী শিবিরের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুখালী সেনা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় সরকারি খাস জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং সেখানে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই এলাকায় বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে প্রায় ৩৫টি অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছিল। এসব স্থাপনায় অবস্থান নেওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এর আগে সেনা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় শরণার্থী শিবিরের বাইরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে তাদের নিবন্ধিত ক্যাম্পে ফেরত পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে নূরুল সওদাগরকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানের পরও নূরুল সওদাগর তার বাড়িতে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। এতে সেনা ক্যাম্পের নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবৈধ বসবাসের সুযোগ তৈরি হলে মাদক পাচার, অস্ত্রের বিস্তার ও অপরাধী চক্রের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, জুলু ডাকাত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা হলেও সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানোর কারণে অনেকেই আদালতে সত্য ঘটনা বলতে সাহস পান না। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলা ও আদালতের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী অপরাধী চক্রের ভয়ে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রাতে চলাচল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ি ফেরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা নিয়েও অনেকে আতঙ্কে থাকেন।

স্থানীয়দের মতে, বালুখালীতে অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই, অপহরণ এবং শরণার্থী শিবিরের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবৈধ বসবাস, এই কয়েকটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ফলে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, পুরো অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে অস্ত্রের উৎস, মাদক সরবরাহের পথ, অর্থের লেনদেন এবং অবৈধ আশ্রয়দাতাদের বিষয়ে সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার দাবি জানিয়েছেন।

সিয়াম সরিষা
Link copied!