একটি রাষ্ট্র বা সামাজিক কাঠামোর মূল শক্তি লুকিয়ে থাকে প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর। আর সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে এই প্রশাসনিক কাঠামোর যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি ঘটে মাঠপর্যায়ে—সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি)-র দপ্তরের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষের চোখে বেশিরভাগ সময়ই এই পদগুলো কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দান কিংবা সামাজিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা দেয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ক্ষমতা কোনো স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া বা শাসনের ছড়ি ঘোরানোর সরঞ্জাম নয়; বরং ক্ষমতার প্রকৃত নির্যাস নিহিত থাকে 'জনসেবা' ও 'জবাবদিহিতা'র সুদৃঢ় অঙ্গীকারে।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি সেবা প্রদান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাঠ প্রশাসনের এই কর্মকর্তারা জনগণের খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন। একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনো ভূমিসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন, দুর্যোগকালীন সহায়তা চান কিংবা সুবিচারের আশায় সরকারি দপ্তরে আসেন, তখন তাঁর কাছে এই পদাধিকারী ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ প্রতিচ্ছবি। ফলে তাঁদের একটি সিদ্ধান্ত যেমন একজন মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে, তেমনি একটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করতে পারে চরম অনিশ্চয়তা।
ইতিহাসের ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা হওয়া উচিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর্মকর্তাদের নিজেদের শুধুই 'শাসক' মনে করার মানসিকতা বহু আগেই ভেঙে যাওয়া উচিত ছিল। জনগণ আজ কেবল প্রশাসনিক আদেশের অনুগত গ্রহীতা নয়, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার ও সেবা পাওয়ার প্রকৃত দাবিদার। তাই যখন একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁর ভূমি অফিসকে সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত, দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও সেবাবান্ধব করে তোলেন, যখন একজন ইউএনও সকল রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করেন, কিংবা একজন জেলা প্রশাসক জনদুর্ভোগ কমাতে সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হয়ে কথা বলেন—তখনই প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও গণমুখী শাসনের প্রকাশ ঘটে।
গণমুখী ও জবাবদিহিতামূলক সুশাসন কোনো অলীক শব্দমালা নয়; এটি বাস্তবায়নের জন্য কেবল প্রয়োজন সদিচ্ছা ও মানসিকতার পরিবর্তন। প্রতিটি দপ্তরে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষের কথা শোনার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং প্রতিটি কাজের দায়ভার গ্রহণে দ্বিধাবোধ না করাই সুশাসনের মূল চাবিকাঠি। কর্মকর্তারা যদি নিজেদের 'প্রভু' বা 'শাসক' হিসেবে মনে না করে জনগণের প্রকৃত 'সেবক' ও 'উন্নয়নের অংশীদার' হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন, তবে মাঠ প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে।
ক্ষমতার দাপট দিয়ে সাময়িক ভয় বা আনুগত্য অর্জন করা যেতে পারে, কিন্তু স্থায়ী জনকল্যাণ, সম্মান কিংবা শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা কখনোই সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্বকে জনগণের সেবার হাত হিসেবে বাড়িয়ে দেওয়াই একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রকৃত সাফল্য। মাঠ প্রশাসনের সকল স্তরে এই সেবামুখী মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে একটি জনকল্যাণমুখী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন কেবল প্রত্যাশাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বাস্তবতায় রূপ নেবে।

আপনার মতামত লিখুন :