চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে কেশবপুরে অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, ছানী রোগী শনাক্তকরণ এবং অপারেশনের সুযোগ পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে অসংখ্য অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জীবনে। ক্যাম্পে মোট ২৪০ জন রোগীকে চক্ষু সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১৮ জন ছানী রোগী ও ৪ জন অন্যান্য বিশেষ রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। ৩০ আগস্ট স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা সমাধান-এর ব্যবস্থাপনায়, অরবিস ইন্টারন্যাশনাল-এর অর্থায়নে এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল-এর সহযোগিতায় কেশবপুরে এ ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। সমাধান সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ক্যাম্পে খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডা. বৃন্তা সাহা ও তাঁর সহকারী চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
সকাল থেকেই কেশবপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চোখের নানা সমস্যা নিয়ে রোগীরা ক্যাম্পে উপস্থিত হন। উন্মুক্ত এ ক্যাম্পে আগত প্রত্যেক রোগীকে বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ছানী রোগীদের শনাক্ত করা হয় এবং অন্যান্য রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। ক্যাম্পে শনাক্ত হওয়া ছানী ও অন্যান্য বিশেষ রোগীদের মধ্যে ৫৫ জনকে বিনামূল্যে অপারেশনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে খুলনার শিরোমণি বাদামতলা এলাকায় অবস্থিত বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে নিজস্ব গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। অপারেশন শেষে তাদের পুনরায় নিজস্ব পরিবহনে কেশবপুরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া শনাক্ত হওয়া অবশিষ্ট ৬৩ জন রোগীকে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর একই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনের ব্যবস্থা করা হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভোগা এসব মানুষের অনেকেরই নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চোখের আলো ফিরিয়ে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য’ সমাধান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম বলেন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই এ ধরনের কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে ছানী রোগের কারণে অনেক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। সময়মতো শনাক্ত করে বিনামূল্যে অপারেশনের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়। সমাধান সংস্থা ভবিষ্যতেও মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতার কারণে কেশবপুরের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও বিনামূল্যে বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে। সমন্বিত উদ্যোগে আরও মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাবে’সমাধান সংস্থার পরিচালক (সার্বিক) মোঃ শাহীনুর রহমান বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ অর্থনৈতিক কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। এ ধরনের ক্যাম্প তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোগী শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে হাসপাতালে নেওয়া, অপারেশন এবং পরবর্তীতে তাদের নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে দৃষ্টিশক্তি রক্ষা সম্ভব’ সমাধান সংস্থার পরিচালক (কার্যক্রম) আবু জাফর মাতুব্বর বলেন, চোখের সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ক্যাম্পে প্রাথমিকভাবে রোগীদের পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাদের অপারেশন প্রয়োজন, তাদের বিনামূল্যে অপারেশনের আওতায় আনা হচ্ছে।অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের দায়িত্ব’ সমাধান সংস্থার পরিচালক (অর্থ) মোঃ শাহাদাৎ হোসেন বলেন, একটি মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া তার নিজের পাশাপাশি পুরো পরিবারের জন্যও স্বস্তির বিষয়। অর্থের অভাবে যাতে কোনো মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী মোঃ মুনছুর আলী বলেন, কেশবপুরে আয়োজিত ক্যাম্পে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। অনেক রোগী দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পাশাপাশি ছানী রোগীদের অপারেশনের ব্যবস্থা হওয়ায় তারা উপকৃত হয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ ধরনের সেবা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি রোগীদের,ক্যাম্পে আসা রোগীদের অনেকেই জানান, দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা এবং অপারেশনের সুযোগ পাওয়ায় তারা স্বস্তি প্রকাশ করেন। বিশেষ করে ছানী রোগীদের জন্য হাসপাতাল পর্যন্ত যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং অপারেশনের পর পুনরায় কেশবপুরে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগকে তারা অত্যন্ত মানবিক বলে উল্লেখ করেন।
ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন সমাধান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম, পরিচালক (সার্বিক) মোঃ শাহীনুর রহমান, পরিচালক (কার্যক্রম) আবু জাফর মাতুব্বর, পরিচালক (অর্থ) মোঃ শাহাদাৎ হোসেন, প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী মোঃ মুনছুর আলীসহ সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।আয়োজকদের মতে, এমন উদ্যোগ শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। কেশবপুরের এ চক্ষু ক্যাম্প তাই হয়ে উঠেছে মানবিক সহায়তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

আপনার মতামত লিখুন :