যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে ১৭৪ পৃষ্ঠার দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন উধাও!

01. মোঃ খায়রুল আলম রফিক , প্রধান সম্পাদক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে ১৭৪ পৃষ্ঠার দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন উধাও!

ফাইল ফটো

মোঃ খায়রুল আলম রফিক: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি’ বাস্তবায়নে ময়মনসিংহ বিভাগে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই প্রায় ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি জামালপুর, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলায় আরও বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ আত্মসাৎ  নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় একাধিকবার তদন্ত হলেও অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি। বরং ময়মনসিংহ জেলায় পরিচালিত একটি তদন্তের ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তা যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকেই গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক (ডিডি) তদন্ত কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার দাবি, তিনি ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের  নির্দেশে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রায় ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকার প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত করে ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। ২০২৫ সালের ২৩ জুন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেটি আর পাওয়া যাচ্ছে না।

চার জেলায় শত শত কোটি টাকার প্রকল্প

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের চার জেলায় বিভিন্ন সময়ে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। শেরপুরে ২০১৪ থেকে ২০১৬, জামালপুরে ২০১৮ থেকে ২০২০, ময়মনসিংহে ২০১৬ থেকে ২০২১ এবং কিশোরগঞ্জে ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পে প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন, সম্মানী বিতরণ ও কর্মসংস্থানের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও এর একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় হয়নি। কোথাও ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী, কোথাও বেনামি প্রশিক্ষক এবং কোথাও জাল জাতীয় পরিচয় পত্র, বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষ করে জামালপুর ও শেরপুরের কয়েকটি উপজেলায় অধিকাংশ সুবিধাভোগী ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এমন অভিযোগও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে এসেছে। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলাতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

এক কর্মকর্তার হাতে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক বর্তমানে নেত্রকোনা জেলায় কর্মরত  ফারজানা পারভীন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ ও জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালনকালে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সমাপ্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তার স্বামী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স পরিষদের আওয়ামীপন্থী সংগঠনের সাবেক সভাপতি ছিলেন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কারণে ফারজানা পারভীন প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন বলেই তাকে তিনটি জেলায় দায়িত্ব পালন করার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিন দফা তদন্ত, উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার তদন্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তকারীদের মধ্যে ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব লুলু বিলকিস, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক মফিজ উদ্দিন এবং ময়মনসিংহের সাবেক উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া।

অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দিকের তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো যথাযথভাবে উঠে আসেনি। প্রভাবশালী মহলের চাপ ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তদন্তকে প্রভাবিত করা হয়েছিল।

তবে উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার তদন্তে ময়মনসিংহ জেলাতেই বিপুল অঙ্কের অর্থের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে বলে তিনি দাবি করেছেন।

১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন কোথায়?

উপ-পরিচালক (ডিডি) তদন্ত কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া দৈনিক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, “ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের নির্দেশে আমি তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করি। প্রায় ২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত করে ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করি। ২০২৫ সালের ২৩ জুন প্রতিবেদনটি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে জানতে পারি, প্রতিবেদনটি আর পাওয়া যাচ্ছে না। ”তার দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তাকে ভোলা জেলায় বদলি করা হয়। তিনি এটিকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ডিডি রোকন উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাহার করার জন্য বিভিন্ন সময় তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “চাকরি চলে গেলেও বা আমার মৃত্যু হলেও দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাহার করব না।”

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে ময়মনসিংহের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভীনসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগে ময়মনসিংহের গৌরীপুর, ত্রিশাল, হালুয়াঘাট ও ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের নামে বরাদ্দকৃত প্রায় ১৮০ কোটি টাকা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

অভিযোগের অনুসন্ধানে দুদক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের শুরু ও শেষের তারিখ, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা, প্রশিক্ষণসূচি, প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী বিতরণের মাস্টাররোল, ব্যাংক হিসাব, ক্যাশবই, বরাদ্দপত্র এবং আইবাস++-এ ব্যয়ের তথ্যসহ বিভিন্ন নথি চেয়েছে।

আদালতের আদেশেও তদন্তের নির্দেশ

ময়মনসিংহ জজ আদালতের আইনজীবী শেখ আবু সাদাত খায়ের জানান, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অনিয়মের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনি আদালতে শুনানি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত দুর্নীতি দমন কমিশন, ময়মনসিংহ কার্যালয়কে বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার উল্লেখ রয়েছে। মামলাটির নম্বর ০১/২০২৩।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়?

অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ও একাধিক তদন্ত থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এখনও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বা মামলা থাকলেও তাদের বদলি কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এমনকি দুদকের মামলার আসামি হিসেবে নাম আসা কর্মকর্তারাও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে কর্মরত থেকে নিয়মিত দুদকের ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয় ও মন্ত্রণালয় যোগাযোগ রেখেছেন। 

প্রতিবেদন গায়েবের দায় কার?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ১৭৪ পৃষ্ঠার সেই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে। একজন সরকারি কর্মকর্তা তদন্ত করে প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর সেটি কীভাবে অদৃশ্য হলো তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

প্রতিবেদনটি যদি সত্যিই মন্ত্রণালয়ে জমা হয়ে থাকে, তাহলে এর নথি কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে, কে তা গ্রহণ করেছিলেন, নথির ডায়েরি নম্বর কী, পরবর্তীতে কোন দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল এবং বর্তমানে সেটির অবস্থান কোথায় এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও দায়িত্বশীল কেউ প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি বলে জানা গেছে।

তদন্তের দাবিতে নতুন করে প্রশ্ন

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে। শুধু ময়মনসিংহেই ২৯২ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং চার জেলায় প্রায় ৭০৫ কোটি টাকার বেশি প্রকল্প ব্যয়ের অভিযোগ ও হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফলে চার জেলার প্রকল্পের সব নথি, প্রশিক্ষণার্থী তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক লেনদেন, মাস্টাররোল, বিল-ভাউচার, আইবাস++ তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

একই সঙ্গে ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনটি কোথায় গেল, সেটি গায়েবের সঙ্গে কেউ জড়িত কি না এবং তদন্ত কর্মকর্তার ওপর চাপ বা বদলির অভিযোগের সত্যতা কী এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও সচিব মাহাবুব উল আলমের যোগসাজশে তদন্ত ফাইল গায়েব হয়েছে বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে। এবিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহাবুব উল আলমের বক্তব্য জানতে বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোন উত্তর মেলেনি।

 

সিয়াম সরিষা
Link copied!