ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি’ প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ অপচয় সংক্রান্ত ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে ভোলায় কর্মরত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঞাকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রমাণপত্র, সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য-উপাত্তসহ তাকে স্বশরীরে মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে তাকে। মন্ত্রণালয়ের যুব-১ শাখা থেকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা এক জরুরি চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ উল্লাহ।
মন্ত্রণালয়ের চিঠি সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ‘দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’-এ ‘ন্যাশনাল সার্ভিসে ২৯২ কোটি টাকা দুর্নীতি-অপচয়: ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব!’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগ এবং এ বিষয়ে করা তদন্তের ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে ভোলায় কর্মরত উপপরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঞাকে তদন্ত সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, তথ্য ও প্রমাণাদিসহ মন্ত্রণালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত মূল চিঠি, মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনের রিসিটের মূল কপি, তদন্ত প্রতিবেদনের কপি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাকে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনের ৫৩৬ নম্বর কক্ষে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকা বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে সাংবাদিক মো. খায়রুল আলম রফিক ২০২১ সালের ১১ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তৎকালীন ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঞাকে।পরবর্তীতে সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিক বাদী হয়ে ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা করেন। মামলা নম্বর ০১/২০২৩। আদালতের নির্দেশে মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ময়মনসিংহকে অনুসন্ধানের জন্য দেওয়া হয়।
মামলাটিতে ময়মনসিংহের সাবেক উপপরিচালক এবং বর্তমানে নেত্রকোনায় কর্মরত উপপরিচালক ফারজানা পারভীন, শেরপুর জেলার উপপরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়।অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমানে ময়মনসিংহ বিভাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অর্থ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সরেজমিন তদন্ত শেষে উপপরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঞা ২০২৫ সালের ২৩ জুন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, দাখিলের প্রমাণপত্র এবং বর্তমানে নথিটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাকে পুনরায় মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঞাকে ময়মনসিংহ থেকে ভোলা জেলায় বদলি করা হয়। অন্যদিকে তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাদের কয়েকজন এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে একটি সূত্রের দাবি, ১৭৪ পৃষ্ঠার ওই তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে গায়েব হয়ে থাকতে পারে এবং এর পেছনে একটি প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা থাকতে পারে। এমনকি প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
‘দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’-এর অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির কথিত অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগেরও তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনটির বর্তমান অবস্থান। প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছিল কি না, দাখিল হয়ে থাকলে সেটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তলব করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভোলা জেলার উপপরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঞা বলেন, “দৈনিক প্রতিদিনের কাগজে সংবাদ প্রকাশের পর আমাকে মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি কি না এবং এ সংক্রান্ত কী কী কাগজপত্র রয়েছে, তা অবহিত হওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছে।”
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর সেটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং তদন্ত কর্মকর্তাকেই পুনরায় প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ মন্ত্রণালয়ে তলব করার ঘটনায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

আপনার মতামত লিখুন :