হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে শামীম ওসমানের পালিয়ে যাওয়ার নতুন তথ্য ফাঁস

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১ জুন, ২০২৫, ০২:৫৫ পিএম

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে তৃণমূল প্রায় সব নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। এটি এখন অনেকটাই পুরনো কথা। কেউ কেউ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়েছেন, কেউবা বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার অনেকে বিমানবন্দর কিংবা সীমান্তে আটক হয়েছেন। কিন্তু আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিক শামীম ওসমানের দেশত্যাগ নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এতদিন ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বেনাপোল বা আগরতলা সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিনি বেছে নিয়েছিলেন অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত পথ।

সূত্র অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের দিন দুপুরের পর শামীম ওসমান চুপিসারে রাইফেলস ক্লাব ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার এক অজ্ঞাত বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেই অবস্থান করে তিনি জানতে পারেন, তার নিজের বাসা এবং ভাই সেলিম ওসমানের বাড়িতে জনতা হামলা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। আতঙ্কিত শামীম ওসমান পালানোর জন্য যোগাযোগ করেন কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগী ও এক সীমান্ত দালালের সঙ্গে। তাদের সহায়তায় তিনি গোপনে রওনা দেন ময়মনসিংহের উদ্দেশে। এ যাত্রায় তিনি একা ছিলেন, পরবর্তীতে তার স্ত্রী সালমা লিপি ও ছেলে অয়নও আলাদা ভাবে একই সীমান্ত দিয়ে দেশত্যাগ করেন।

বোরকা পরে রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু করেন শামীম ওসমান। সাইনবোর্ড থেকে রামপুরার রাস্তাটি এড়িয়ে নিরাপদে ঢাকা বাইপাস হয়ে গাজীপুর, তারপর ময়মনসিংহে পৌঁছান। গন্তব্যের কাছাকাছি এসে গাড়ি ছেড়ে স্থানীয় সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত রিকশায় হালুয়াঘাট সীমান্তের দিকে রওনা হন। পুরো পথজুড়ে তিনি ছিলেন নীরব, কারণ তার পরিচয় প্রকাশ পেলেই হুমকিতে পড়তে পারতেন। মুখ ঢেকে থাকলেও তার গলার স্বর শনাক্ত করে ফেলতে পারে কেউ এই আশঙ্কায় ছিলেন নিঃশব্দ।

স্মৃতিময় এই রাতের যাত্রায় তার মনে পড়ে যায় পুরনো দিনগুলোর কথা। ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে ২০০১ এবং ২০০৭ সালে আরও দুবার পালিয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ও মুখ ঢেকে, বোরকা পরে সীমান্ত পেরিয়ে গিয়েছিলেন। তবে এবারের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন পালাতে হতো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চোখ এড়িয়ে, এবার পাড়ি দিতে হয়েছে সজাগ ছাত্র-জনতার নজর এড়িয়ে।

অবশেষে আ’লীগ নেতা আব্দুর রহমানের মাধ্যমে ৮২ লাখ টাকার বিনিময়ে কাঠ-বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে হালুয়াঘাটের সীমান্ত পার হয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে পৌঁছান শামীম ওসমান। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন তার স্ত্রী ও পুত্র। সেখান থেকে তারা একত্রে যান পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়, পরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। 

ধোবাউড়ার সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ডুনেন চাকমা জানান, নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম উসমান ৮২ লাখ টাকার বিনিময়ে শিলং পালিয়ে গেছেন। আমি জানতে পারি সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন এর পিএস হালুয়াঘাটের বাসিন্দা আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল রহমানের মাধ্যমেই পালিয়েছিলেন।

জানতে চাইলে হালুয়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নই। কারণ আমি জয়েন করেছি গত মাসের ১৯ তারিখে।

অভ্যুত্থানের এক মাস পর, ৬ সেপ্টেম্বর দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে তাকে দেখা যায় মাথায় আঘাতের চিহ্ন নিয়ে। সেদিন সেখানে শেখ হাসিনার জন্য মিলাদ আয়োজন করেছিলেন তিনি। এসময় তিনি দিল্লিতে ভারতের শরণার্থী আশ্রয়ে আছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এরপর শামীম ওসমান পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে, যেখানে তার নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। গুজব ছড়ায়, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা দুবাইয়ে তার সেই বাড়িতে ওঠবেন। তবে এখন পর্যন্ত সে ঘটনা ঘটেনি।

‘খেলা হবে’ যে স্লোগানে এক সময় রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন শামীম ওসমান, সেই খেলার মাঠ থেকে এবার অনেক দূরে। নিজেরই মুখবন্ধ স্লোগানের মাঝে হারিয়ে যাওয়া এক বিতর্কিত নেতার গল্প এটি যার শেষ দৃশ্য আঁধারে ঢাকা, গন্তব্য অনিশ্চিত।

Advertisement

Link copied!