পুলিশ পরিদর্শক আল হেলাল মাহমুদের পদোন্নতি ও আকস্মিকভাবে ভুরুঙ্গামারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগে পরিদর্শক (নিরস্ত্র) পদে কমপক্ষে ৩ বছর পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই নীতিমালা উপেক্ষা করে মাত্র ১ বছর ৩ মাসের অভিজ্ঞতা নিয়েই আল হেলাল মাহমুদকে ওসি পদে নিয়োগ দিয়েছেন কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মাহফুজুর রহমান।
তথ্য অনুসারে, আল হেলাল মাহমুদ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে এসআই (নিরস্ত্র) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ৪ অক্টোবর ২০২৩ সালে তিনি পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) পদে পদোন্নতি পান। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর ৩ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে। কিন্তু তার আগেই তাঁকে ওসি হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করায় নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠে এসেছে।
পরিপত্র ভঙ্গ করলে সম্ভাব্য শাস্তি:
পুলিশ সদর দপ্তরের নীতিমালা ভঙ্গের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুযোগ রয়েছে। শাস্তির মধ্যে আছে, কারণ দর্শানোর নোটিশ, বিভাগীয় তদন্ত, বদলি বা সাময়িক প্রত্যাহার, ভবিষ্যৎ পদোন্নতি বা পদায়ন স্থগিত, গুরুতর ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা বা সতর্কীকরণ। নীতিমালা ভঙ্গকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এতে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ম ভঙ্গ করে এমন পদায়ন পুলিশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে রয়েছে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, নিয়ম মেনে চলা কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যাওয়া।
প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পাওয়া, বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দুর্বল হওয়া, সহকর্মীদের মধ্যে বৈষম্য ও ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাওয়া।
আল হেলাল মাহমুদের পারিবারিক রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাও এই নিয়োগ–বিতর্কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তিনি নীলফামারীর বাসিন্দা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে তাঁকে দ্রুত ওসি পদে পদায়ন করা হয়েছে।
তাঁর বড় ভাই নীলফামারী জেলা জাতীয় পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতা, যিনি অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সময় নানা সুবিধা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় এলাকাবাসী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও মাঠপর্যায়ে এ পদায়নকে “নিয়ম ভঙ্গ, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের সরাসরি উদাহরণ” হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরেও এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
পদায়ন–বিতর্কে পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন “এটি স্পষ্টতই পুলিশ সুপারের গাফিলতি এবং দুর্নীতির উদাহরণ। নিশ্চয়ই প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়েই তাকে পদায়ন করা হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করে।”
ভুরুঙ্গামারী থানার ওসি আল হেলাল মাহমুদ বলেন,“আপনারা সংবাদ প্রকাশ করুন, সমস্যা নেই। ওসি হতে হলে সক্ষমতা লাগে সেটি আমার আছে বলেই এই চেয়ারে বসেছি।
”এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মাহফুজুর রহমান“নিয়ম মেনেই তাকে ওসি করা হয়েছে।” ওসি নিয়োগে কত বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন এ প্রশ্নের জবাবে এসপি জানান,“উপর থেকে নির্দেশনা এসেছে।”
আপনার মতামত লিখুন :