৩৮৭১ কোটি টাকার দুই প্রকল্পে একই কর্মকর্তার দায়িত্ব: ডিপিএইচইতে তীব্র বিতর্ক

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:২৩ পিএম

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দপ্তর ও মন্ত্রণালয়। বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকার ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্প’-এর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন তিনি।

 

ওই প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও সম্প্রতি তাকে আরও একটি নতুন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার বাজেট প্রায় ১ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। ফলে মোট ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকার দুই প্রকল্প এখন একই ব্যক্তির হাতে, যা নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা।

 

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে—কেন এত বিতর্কের মধ্যেও তবিবুর রহমানকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়া হলো? সূত্র বলছে, তিনি নিজেই ঘনিষ্ঠদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, প্রথম প্রকল্পের পরিচালক পদ পেতে তাকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এবার প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসতে আরও ১৫ কোটি টাকা লেনদেনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও আলোচনা চলছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীকে অর্থের বিনিময়ে সন্তুষ্ট রেখে তিনি এই পদে আসীন হয়েছেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মীর আব্দুস সাহিদ অবসরে গেলে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য তবিবুরের দৌড়ঝাঁপ চলছে জোরেশোরে। এ ক্ষেত্রে ২৪ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে উপেক্ষা করে তিনি পদোন্নতির চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তবিবুরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রকল্পের বিভিন্ন টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল ছাড় দিয়েছেন এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন নিয়েছেন। প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তার প্রভাবের কারণে অনেক সময় কাজের মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারেননি।

 

 

 

নতুন নিয়োগ পাওয়া ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর বাজেট ১ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। দেশের দুর্গম এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ২ লাখ ৭৪ হাজারেরও বেশি টুইনপিট ল্যাট্রিন ও প্রায় ২ হাজার কমিউনিটি টয়লেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে প্রকল্পটিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি, যা অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ।

 

তবে তবিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, “কে আমাকে প্রস্তাব করেছে বা নিয়োগ দিয়েছে—সেটা সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসা করুন। এসব নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না।”

 

ঘুষের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আমি ১০ কোটি টাকা দিয়ে পিডি হয়েছি—এটার প্রমাণ দিন। উদ্দেশ্য বুঝে গেছি, যা খুশি করেন।”

 

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী জানান, ডিপিএইচই থেকে প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্য থেকে কমিটি বিবেচনা করে যাকে উপযুক্ত মনে করেছে, তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। “বিশ্বব্যাংকের তাড়াহুড়োর কারণে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হয়। তার অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানা ছিল না,” বলেন সচিব। তিনি আরও জানান, দুদক থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মীর আব্দুস সাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

 

প্রকৌশলী তবিবুর রহমান তালুকদার আওয়ামী শাসনামলে আলোচিত ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া তদন্ত ও নতুন পদে নিয়োগ—উভয় বিষয়ই এখন প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

Advertisement

Link copied!