বদলি-নিয়োগ- ফিডিং-তিন খাতে গভীর দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে পুরো অধিদপ্তর

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:৩৬ পিএম

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এখন নানামুখী অভিযোগে জর্জরিত। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি— শিক্ষকুকর্মকর্তাদের কল্যাণের পরিবর্তে দপ্তরটি অনেক দিন ধরেই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নানা অনিয়মুঅসদুপায়, অস্বচ্ছ ব্যয় ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা পুরো দপ্তরকে নুইয়ে ফেলেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মহাপরিচালক আবু নূর মোঃ শামসুজ্জামান। অভিযোগকারীরা বলছেনতিনি নিয়মুকানুন উপেক্ষা করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সেমিনার, ওয়ার্কশপ, ভ্রমণ ও নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যার বড় অংশই অপ্রয়োজনীয়। তাদের মতে—এই অর্থ মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকুশিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করা হলে প্রাথমিক শিক্ষার অস্থিরতা কমে আসত।

বদলি সিন্ডিকেট: মাঠপর্যায়ে চরম বিশৃঙ্খলা: স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে চালু হওয়া ডিজিটাল বদলি ব্যবস্থা বর্তমানে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেটের দখলে—এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। তাদের দাবি—সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে উপপরিচালক পর্যন্ত কেউই বদলির ক্ষমতা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন না; তারা কেবল আবেদন ফরোয়ার্ড করেন। পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন শিক্ষা অফিসার মোঃ শরিফুল ইসলাম। তার “মনোনয়ন নিয়ন্ত্রণকে” ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। ফলে এটিও থেকে ডিডি পর্যন্ত স্বাভাবিক নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে না—ফলে মাঠপর্যায়ে ভয়াবহ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের একটি অংশের।

নিয়োগ শাখায় দুই দশকের প্রভাববলয়: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়োগ শাখা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় অভিযোগের জায়গায় রয়েছেন শিক্ষা অফিসার এস.এম. মাহবুব আলম, যিনি ১৫ বছর ধরে একই শাখায় থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্থবির করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ। অভিযোগকারীরা বলছেন—বছরের পর বছর তিনি কোনও এডি নিয়োগ করতে দেননি; বরং নিয়োগুবাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। এই চক্রে শিক্ষা অফিসার আজহারুল ইসলাম, হাবিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের নেটওয়ার্ক রয়েছে, যারা নিয়োগুবদলির নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

স্কুল ফিডিং প্রকল্প: শর্তের দেয়ালে আটকে প্রতিযোগিতা: স্কুল ফিডিং কর্মসূচির দরপত্রে এমন কিছু অস্বাভাবিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা অধিকাংশ ঠিকাদারকে অযোগ্য করে দেয়। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে টানা তিন বছরের নিরবচ্ছিন্ন অডিট, ১৮ কোটি টাকার একক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা, ইত্যাদি।

অভিযোগকারীরা বলছেন—এটি পূর্বনির্ধারিত একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক যৌথভাবে হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজ নিয়ন্ত্রণ করছেন—এমন অভিযোগও ওঠে। একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মন্তব্যের কারণে তাকে ওএসডি করা হলে প্রকল্পটি নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি: অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিন :  অভিযোগকারীরা বলেন ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর জোর দিলেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অনিয়মের কাঠামো অক্ষত রয়েছে। তাদের মতে—দপ্তরের অব্যাহত বিশৃঙ্খলা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎকে বিপদের মুখে ফেলছে। তাই দ্রুত তদন্ত, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অভিযোগে উল্লেখিত কর্মকর্তাদের তালিকা

১। মহাপরিচালক, ২। এডিজি PEDP 4

৩। পরিচালক (প্রশিক্ষণ),৪। শিক্ষা অফিসার আজহারুল ইসলাম

৫। এস.এম. মাহবুব (নিয়োগ শাখা)

৬। জয়ন্তী প্রভা দেবী,৭। শিক্ষা অফিসার শরিফুল ইসলাম

৮। শিক্ষা অফিসার তানভীর, ৯। তাপস (স্কুল ফিডিং প্রকল্প)

১০। সিরাজুল (স্কুল ফিডিং প্রকল্প)

১১। মেরিনা হাসনাত, সহকারী শিক্ষা অফিসার, ১২। মোস্তাহেদা পারভীন মৌ, সহকারী শিক্ষা অফিসার। অভিযোগকারী মহলের দাবি—স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এই কর্মকর্তাদের অধিদপ্তর থেকে অবিলম্বে সরিয়ে দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

Advertisement

Link copied!