ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প থমকে, ব্যয় বাড়লেও কাজের অগ্রগতি নেই

মোঃ আব্দুস সামাদ আজাদ , মৌলভীবাজার জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর, ২০২৫, ০৫:২৯ পিএম

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটির ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, অথচ কাজ এগোচ্ছে না। প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্প এখন কার্যত স্থবির। চার বছরেও ৪৫.৫ কিলোমিটার জমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশ, ফলে মেয়াদ আবারও বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে সংস্কারহীন মোট ২০৯ কিলোমিটার সড়কে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ, ভোগান্তির শেষ নেই যাত্রীদের।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিস্তারিত নকশা (ডিপিপি) প্রথম প্রস্তুত হয় ২০১৪–১৫ সালে চীনের অর্থায়নে। পরবর্তীতে চীনা অর্থায়ন বাতিল হলে প্রকল্পটি নেয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার।

প্রকল্পটি কাঁচপুর ইন্টারসেকশন থেকে শুরু হয়ে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট পেরিয়ে তামাবিল পর্যন্ত বিস্তৃত। মোট দৈর্ঘ্য ২১০ কিলোমিটার, যার মধ্যে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করা হবে।

উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ ৬ লেনে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, ১৩টি ফ্লাইওভার/আন্ডারপাস ও ২৬টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩টি প্যাকেজে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হলেও জমি না পাওয়ায় তারা কাজ শুরু করতে পারছেন না।

২০১৫ সালের নকশায় সার্ভিস লেনের প্রস্থ ছিল ৩.৬ মিটার। এডিবির শর্তে ২০২০ সালে তা বাড়িয়ে ৫.৫ মিটার করা হয়, ফলে ভূমি অধিগ্রহণও বাড়ে। এ কারণে ২০২১ সালে সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা, তবে বাস্তবে ব্যয় আরও বাড়ছে।

মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে, বিমসটেক ও সার্ক হাইওয়ে করিডরের অংশ হওয়ায় এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। শিল্পকারখানা, পর্যটন ও ট্রেডের বিস্তারের কারণে গত দুই দশকে যানবাহনের চাপ বহুগুণে বেড়েছে। যানজট, নাজুক রাস্তা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির কারণে এখন ঢাকা–সিলেট যাত্রায় সময় লাগে ৭–৮ ঘণ্টা, কখনো ১০ ঘণ্টাও।

সরেজমিন দেখা যায়, দীর্ঘদিন বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় মহাসড়কের সর্বত্র সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। প্রকল্প প্রক্রিয়ার দায়ে বিগত ৫ বছর উল্লেখযোগ্য রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। বর্তমান অবস্থায় রুটটি সচল রাখতে আরও কমপক্ষে ২ বছর মেরামতের প্রয়োজন হবে।

প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ফজলুল করিম বলেন— “৬৬টি এলএ কেসের মধ্যে মাত্র ১৩টি নিষ্পত্তি হয়েছে। জমি বুঝে না পাওয়ায় ঠিকাদাররা কাজ শুরু করতে পারছে না। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প সময় আছে, তবে জমি অধিগ্রহণ শেষ না হলে মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।”

অন্যদিকে জমি অধিগ্রহণ শাখার পিডি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ মো. নাজমুল হুদা জানান— “জমি অধিগ্রহণের সময় আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দ্রুতগতিতে নথি নিষ্পত্তির কাজ চলছে। এ ধারা বজায় থাকলে বর্ধিত সময়ের মধ্যেই অধিগ্রহণ শেষ সম্ভব।”

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পটি কেবল একটি অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; এটি দেশের আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। অথচ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে শৈথিল্যের কারণে আজ এটি দুর্নীতি, ব্যয়বৃদ্ধি ও অদক্ষতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনগণের কষ্ট, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষতি— সবকিছুর দায় কারো না কারো ঘাড়ে বর্তাবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়টি থেকে যাবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দক্ষতার প্রশ্নবিদ্ধ কাঠামোর উপর।

Link copied!