রিয়াজ ফরাজী, বোরহানউদ্দিন: ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় পরিবেশ আইন অমান্য করে কৃষিজমির মাটি কেটে সরবরাহ করা হচ্ছে ইটভাটায়। এতে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, কৃষিজমি, চর ও নদীর তীরবর্তী স্থানে মাটি কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ বলছে, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও ফসলি জমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ ছাড়া কোনো সড়ক ও মহাসড়ক থেকে অর্ধকিলোমিটার দূরত্বে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কিন্তু বোরহানউদ্দিনে কিছু ইটভাটা আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে। প্রশাসন এই ভাটাগুলোকে কিভাবে ছাড়পত্র দেয়- এই প্রশ্ন তুলছে অনেকে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রকাশ্যে দিনেদুপুরে কৃষিজমি থেকে মাটি খনন করে বিভিন্ন ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছে ভাটার মালিকরা। ভেকু ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিজমি ও তেতুলিয়া নদী ও মেঘনা নদীর চর থেকে মাটি উত্তোলন করে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করছেন ভাটার মালিকরা। এতে কৃষিজমির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এছাড়া নদী তীরবর্তী জমি থেকে মাটি কাটার ফলে পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ছে, তেমনি ভাঙনের শঙ্কা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।
এছাড়া ইটেরভাটাগুলো কৃষিজমির কাছাকাছি হওয়ায় হুমকির মুখে অন্তত কয়েক একর কৃষি জমি। আইন অনুযায়ী কোনো ইটভাটার এক কিলোমিটারের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থাকলে সেই ইট ভাটা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া ইটের কাঁচামালের জন্য ফসলি জমির মাটি ব্যবহার করা যাবে না। অথচ উপজেলার কয়েকটি ইটভাটা ফসলি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে হওয়ার ফলেও ব্যাবস্থা নিচ্ছেনা প্রশাসন। এসব ইটভাটার কারনে পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
গত রবিবার ঘুরে দেখা গেছে, বোরহানউদ্দিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি ইটভাটা। সাচরা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষিজমি থেকে খননযন্ত্রের সাহায্যে মাটি উত্তোলন চলে। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না।
সরেজমিন দেখা গেছে, বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচরা ও দেউলা ইউনিয়নের ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষিজমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টর-ট্রলিতে করে বোরহানউদ্দিন পৌর শহরের থানার সড়ক ব্যাবহার করে স্থানীয় মেঘনা ব্রিকসে পরিবহন করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্বর্তন কর্মকর্তারাও এই সড়কটি ব্যাবহার করে থাকেন। দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে ইটেরভাটায় মাটি সরবরাহ করা হলেও প্রশাসনের তেমন কোনো আইনি পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। এদিকে ইটের ভাটায় মাটি পরিবহনের কারনে সড়কে মাটি পড়ে সড়কগুলো ব্যাবহারের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দারা।
কৃষিবিদদের মতে, জমির উপরিভাগের চার থেকে ছয় ইঞ্চি গভীরের মাটিতেই মূল পুষ্টিগুণ থাকে। মাটির এই স্তর কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। এ জন্য অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না। এতে সারের পেছনে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ইটভাটার মালিক জানান, তিনি জানেন কৃষিজমি থেকে মাটি নিয়ে ইট প্রস্তুত করার কোনো নিয়ম নেই। তবে সরকার যেসব জায়গা থেকে মাটি নেওয়ার দিকনির্দেশনা দিয়েছে, সেখান থেকে মাটি আনলে তাঁদের অনেক অসুবিধা। খরচও বেশি হয়। যে কারণে কৃষিজমির মাটির ওপর তাঁদের নির্ভর করতে হয়। তিনি আরো বলেন, এলাকার জমির মালিকদের কাছ থেকে আমরা ঘনফুট হিসেবে মাটি কিনি। এটা বৈধ না অবৈধ তা আমার জানা নেই।’
দেউলা ইউনিয়নের কৃষক আফাজ উদ্দিন (৪৫) বলেন, এলাকার কৃষিজমিগুলো এক ফসলি। যে কারণে কৃষকেরা অনেক সময় জমির মাটি বিক্রি করে দেন। মাটির মূল্য একেক সময় একেক রকম হয়। তিনি দুবছর আগে ৩০ শতক জমির মাটি বিক্রি করে ১৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। কয়েক বছরে অসংখ্য ইটভাটা গড়ে ওঠায় কৃষিজমি এখন হুমকিতে পড়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ), ২০১৩ অনুযায়ী কৃষিজমির মাটি কেটে শ্রেণি পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ রয়েছে। এসব কাজে জড়িত ব্যক্তিদের দুই লাখ টাকার জরিমানা ও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ আইনগুলো প্রয়োগ করবেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রনজিৎ চন্দ্র দাস বলেন, এ ধরনের অভিযোগ পেলে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেবে।
আপনার মতামত লিখুন :