শ্রীমঙ্গলে গারোদের ওয়ানগালা উৎসবে রঙ, রীতি ও আনন্দের মেলবন্ধন

মোঃ আব্দুস সামাদ আজাদ , মৌলভীবাজার জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৬:১৪ পিএম

শীতের হালকা রোদ ভেদ করে সকালটা যখন ধীরে ধীরে উষ্ণ হচ্ছিল, তখনই শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া গারো লাইন মাঠে জমতে শুরু করে মানুষের পদচারণা। দূর থেকে ভেসে আসছিল ঢাকের তালে তালে নাচের আবাহন, সাথে হারমোনিয়াম আর গিটারের সুরেলা ঝংকার। গারো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব ওয়ানগালা শুরু হওয়ার আগেই যেন পরিণত হয় এক রঙিন উৎসবমুখর জনপদে।

মাঠের প্রতিটি কোণ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত গারো নারী-পুরুষদের উপস্থিতিতে। কেউ মাথায় ফুলের মুকুট, কেউবা কোমরে রঙিন বেল্ট এ যেন তাদের অস্তিত্বের ভাষা, পরিচয়ের প্রতীক। বর্ণিল পোশাকের জমকালো উপস্থিতির সাথে হাসির ঝিলিক আর উৎসব-আনন্দ মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অনন্য পরিবেশ।

ওয়ানগালা শুধু কোনো উৎসব নয়; এটি কৃষিকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস আর আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। আয়োজকদের ভাষায়, ‘ওয়ানা’ মানে দেবদেবীর দানের উপকরণ এবং ‘গালা’ মানে তা উৎসর্গ করা।

প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী নতুন ধান ঘরে তুলবার আগে শস্যদেবতা মিসি সালজং-এর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রার্থনা না করলে নতুন শস্য গ্রহণ করা যায় না। সময় বদলেছে, ধর্মীয় রীতি বদলেছে তবুও কৃতজ্ঞতার এই ঐতিহ্য আজও একই আবেগে বয়ে চলেছে। এখন অনেকেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও নতুন ফসল যিশু খ্রিস্টের নামে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়েই তাঁরা ওয়ানগালার রীতি অক্ষুণ্ণ রাখেন।

গারো নকমা এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সামুয়েল যোসেফ হাজং বললেন, “ওয়ানগালা আমাদের আত্মপরিচয়ের উৎস। দেবতার নামে উৎসর্গ ছাড়া আমরা নতুন শস্য গ্রহণ করি না এটাই আমাদের চিরন্তন রীতি। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে এই আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

রোববার দিনব্যাপী উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আলাদা রঙে রাঙানো। স্থানীয় শিল্পীরা গিটার, হারমোনিয়াম ও দেশি বাদ্যযন্ত্রের সুরে পরিবেশন করেন নাচ-গান, যা উৎসবকে দেয় উচ্ছ্বাসময় ছন্দ। বাদ্যের তাল ওঠানামার সাথে সাথে তরুণ-তরুণীদের নাচ পুরো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে দেয় আনন্দের তরঙ্গ।

স্বাগত বক্তব্যে শ্রীমঙ্গল ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত ফাদার শ্যামল জেমস গমেজ সবাইকে জানান সাংস্কৃতিক বহুত্বের সৌন্দর্য সম্পর্কে।

অনুষ্ঠানের সভাপতি অনুপ চিসিম এবং প্রধান অতিথি ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন, অতিথি মুজিবুর রহমান, প্রভাস সিংহ, নিলয় রশিদ ও ক্লোডিয়া নকরেক কেয়া সবার বক্তব্যেই ফুটে ওঠে এই উৎসবের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব ও জাতিগোষ্ঠীর অধিকার-সচেতনতার আলো।

ওয়ানগালা যেন একদিনের অনুষ্ঠান হলেও গারো সম্প্রদায়ের কাছে এটি ইতিহাস, উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার মতো এক সাংস্কৃতিক সম্পদ। উৎসবের মধ্য দিয়ে শিশুরা শেখে তাদের ভাষা, পোশাক, রীতি ও গান। বড়রা ফিরে যায় তাদের শেকড়ের কাছে।

মাঠের বাতাসে তখনো ভেসে আসে উৎসবের সুর গানের তালে, ঢাকের ধ্বনিতে, আর মানুষের হাসিমুখে যেন বারবার ফিরে আসে একই বার্তা ফসলের প্রতি কৃতজ্ঞতা, জীবনের প্রতি উৎসব।

Advertisement

Link copied!