৬৮০ কোটি টাকার নদীতীর রক্ষা প্রকল্পে হরিলুট

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৩ মার্চ, ২০২৬, ০১:২৬ এএম

ঝালকাঠিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীতীর রক্ষা কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ৬৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটিতে নিম্নমানের বালু ব্যবহার, ব্লক তৈরিতে বালুর অনুপাতে কম সিমেন্ট দেওয়া এবং কম ওজনের জিও ব্যাগ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে ইতোমধ্যে প্রকল্প থেকে একজন এসওকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এছাড়া ব্লক তৈরির কাজে ব্যবহৃত বালু, জিও ব্যাগ ও ব্লক বাতিল করা হয়েছে। ব্যাগে মানসম্মত বালু না থাকা, বাতিল বালু এখনো সাইট থেকে অপসারণ না করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ না ফেলাসহ নানা অনিয়মে পুরো কাজের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ‘সুগন্ধা নদীর ভাঙন হতে ঝালকাঠি জেলার সদর ও নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষা’ শীর্ষক প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ১৩ দশমিক ২১৫ কিলোমিটার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়েছে, যা শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে। সদর উপজেলায় ১৮টি ও নলছিটিতে ১৬টিসহ মোট ৩৪টি প্যাকেজে কাজ হওয়ার কথা থাকলেও শুরু হয়েছে মাত্র ১৭টির। বাকি প্যাকেজগুলোর কাজ এখনো শুরু হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নদী প্রতিরক্ষা, প্রাক-প্রতিরক্ষা ও মজবুতকরণ—এই তিন ভাগে কাজ চলছে। সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী সদর উপজেলার ভাটারিকান্দা, শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কুতুবনগর এলাকা এবং নলছিটির তিমীরকাঠিতে ভাঙন রোধে ১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বাস্তবায়ন করছে। বোর্ড জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ২১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং ঠিকাদারদের ১৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

গত ৯ নভেম্বর সকালে কুতুবনগর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিম্নমানের বালু দিয়ে ব্লক তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই বালু ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দায়িত্বরত এসওকে প্রত্যাহার করে এবং ঠিকাদারকে নিম্নমানের বালু অপসারণের জন্য চিঠি দেয়।

প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পঙ্কজ কুমার সরকার জানান, নিয়ম অনুযায়ী ১ দশমিক ৫০ এফএম (ফাইননেস মডুলাস) বালু ব্যবহার করার কথা থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমভিবি ও এমটিআই (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ১ দশমিক ৩৭ এফএম বালু ব্যবহার করছিল। এ কারণে টাস্কফোর্স বালু বাতিল করে এবং এক মাস কাজ বন্ধ থাকে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, এক এফএম বালু দিয়েই ব্লক তৈরি করা হয়েছে।

এই প্যাকেজের এসও নাহিদ হাসান জানান, ৪০০ কিউবিক (প্রায় ১৪ হাজার সিএফটি) বালু বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিলের আগে ওই বালু দিয়ে কত ব্লক তৈরি হয়েছে, তা তিনি জানাতে পারেননি।

সাইটে এখনো বাতিল বালুর স্তূপ দেখা যায়। ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা বলেন, সেখানে সার্বক্ষণিক পাহারা রয়েছে, তাই বাতিল বালু ব্যবহারের সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, দায়িত্বরত এসও তানভির শাহরিয়ারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বালু অপসারণের জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

কুতুবনগরে ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫০ মিটার নদী প্রতিরক্ষা কাজ চলছে। ঠিকাদার ইতোমধ্যে ১০ শতাংশ বিল উত্তোলন করেছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ব্লক তৈরিতে ছয় ভাগ বালুর বিপরীতে এক ভাগ সিমেন্ট দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ১২ ভাগ বালুর বিপরীতে এক ভাগ সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। জিও ব্যাগে গাঁথনি বালুর পরিবর্তে ভিটে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জিও ব্যাগে গাঁথনি বালু ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই; ভিটে বালুতে শূন্য দশমিক ৮ এফএম থাকলেই যথেষ্ট।

ভাটারিকান্দা প্যাকেজেও অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। ১০ নভেম্বর সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ব্লক ঢালাইয়ের কাজ চলছে, কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো তদারক কর্মকর্তা উপস্থিত নেই। পরে এসও ওহিদুল ইসলাম উপস্থিত হয়ে জানান, এখানে এক কিলোমিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলা হয়েছে। টাস্কফোর্স ১০টি নিম্নমানের ব্লক বাতিল করেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, যেখানে নদী গভীর ও ভাঙন তীব্র, সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি। এসও ওহিদুল ইসলাম বলেন, অবশিষ্ট পাঁচ থেকে ছয় হাজার জিও ব্যাগ দিয়ে ওই অংশ পূরণ করা হবে। প্রতিটি জিও ব্যাগের ওজন ২৭৫ কেজি হওয়ার কথা জানালেও সাইটে ওজন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মতিন কনস্ট্রাকশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার আবেদ আলী বলেন, প্রতিটি জিও ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু থাকার নিয়ম। সেদিন ওজন মাপার যন্ত্র অন্য সাইটে থাকায় দেখানো যায়নি।

এলাকাবাসীর দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কমপক্ষে ১৫-২০ হাজার জিও ব্যাগ প্রয়োজন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানায়, তাদের কাছে তিন থেকে চার হাজার ব্যাগ রিজার্ভ রয়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা বলেন, লোকবল সংকটের কারণে সব সাইটে নিয়মিত তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। চর ভাটারিকান্দায় বার্জ প্রবেশ করতে না পারায় জিও ব্যাগ ফেলা যায়নি; তবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তা ফেলা হবে। বর্তমানে ২৪ হাজার জিও ব্যাগ রিজার্ভ রয়েছে।

৩৪টি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র ১৭টি শুরু হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, কাজ শুরু না করা ঠিকাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের পিডি (প্রজেক্ট ডিরেক্টর) পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

Link copied!