জাদুকাটায় চার স্তরের চাঁদাবাজি: নিঃশেষ হচ্ছে শ্রমিকের আয়

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম

অমিত তালুকদার: সুনামগঞ্জের জাদুকাটা নদী এককালে হাজারো শ্রমিকের জীবিকার উৎস থাকলেও, বর্তমানে এটি চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র চার স্তরে চাঁদাবাজি করে নৌযান শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ জাদুকরী উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে। রয়েলিটি, বি.আই.ডব্লিউ.টিএ, খাস কালেকশন এবং টুল ট্যাক্স—এই চারটি ধাপে শ্রমিকদের আয় প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এক নৌশ্রমিকের অভিযোগ, "২৫ পয়সার টোল ১.৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে নৌকা আটকে রাখে, অনেক সময় মারধরও করে। আমরা কাজ করবো না চাঁদা দেবো—এইটাই এখন প্রশ্ন।"

বিআইডব্লিউটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী ২৫ পয়সা ট্যাক্স আদায়ের কথা থাকলেও, নৌশ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা করে আদায় করা হচ্ছে। যদিও ইজারাদাররা বিষয়টি অস্বীকার করেন, তবে অনুসন্ধানে ঘটনার সত্যতা মিলেছে। গত ১০ মার্চ বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসন রঙ্গিয়ার চর এলাকায় অতিরিক্ত টাকা আদায় ও রশিদ প্রদান না করার দায়ে একজনকে এক মাসের কারাদণ্ড প্রদান করে। এসময় টোলের চার্টসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ওসির মোবাইল নম্বর দৃশ্যমান স্থানে টানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযানে চাঁদাবাজির প্রমাণ মিললেও, অনুসন্ধানে জানা যায়, দৈনন্দিনই চলছে এই চাঁদাবাজি। নৌশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি রেট ২৫ পয়সা হলেও ইজারাদার কর্তৃপক্ষ ১.৫০ টাকার নিচে মানতে চায় না, বরং নৌকা আটকে রাখে এবং মারধর করে। কিছুদিন পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলার ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়নের এক সদস্যের নৌকা আটকে বাড়তি চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দেওয়ায় তার নৌকা একদিন আটকে রাখা হয়। পরে সংগঠনের লোকজনের হস্তক্ষেপে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে নির্ধারিত চাঁদা রেখে নৌকাটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী নৌকা মালিক মো. আবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, তবুও আমার নৌকা আটকাইছে। ৩ দিন ধরে ঘাটে বসে আছি, টাকা না দিলে ছাড়বে না—এটা কোনো রাষ্ট্রে হতে পারে?"

গত ৪ এপ্রিলও একই চিত্র দেখা যায়। জামালগঞ্জের ফাজিলপুর ঘাটে মো. আবুল হোসেনের নৌকা আটক করে চাহিদামতো চাঁদা দাবি করা হয়। তার মাঝির কাছে বিআইডব্লিউটিএ ১.৫০ টাকা, খাস কালেকশন ১ টাকা এবং টুলট্যাক্স ১.৫০ টাকা দাবি করে। তিনি তাহিরপুরের ইউএনও এবং সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলকে বিষয়টি জানালেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পরে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দেখা যায়, ইজারাদার কর্তৃপক্ষ সুমন নামের এক ছেলে নৌকার নাম এন্ট্রি করে রঙ্গিয়ারচরের আরেকজনকে ফোন করে বলে দেন "মুক্তিযুদ্ধার নৌকাটা ২০০০ রাইখো।"

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার জাদুকাটা নদীর ফাজিলপুর নৌকাঘাট ও সংলগ্ন পাঠানপাড়া খাস কালেকশন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অবৈধ টোল আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এতে নৌযান শ্রমিকরা ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত প্রতি ঘনফুটে ৩০ পয়সা টোলের পরিবর্তে ১ থেকে ১.৫ টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে আদায় করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। একই স্থানে দুটি আলাদা নামে (নৌকা ঘাট টোল ও খাস কালেকশন) ট্যাক্স আদায় করে শ্রমিকদের ওপর দ্বিগুণ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অভিযোগ অভিযুক্ত হিসেবে নাম এসেছে জবা মিয়া (ইজারাদার), মো. জাকেরীন এবং তাদের সঙ্গে ১০-১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের।

নৌযান শ্রমিকদের দাবি, তাদের কোনো সরকারি রশিদ প্রদান করা হয় না এবং মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা হয় না। রশিদ ছাড়া টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌকা আটকে রাখা হয় এবং শ্রমিকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

তবে এই বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক-দুইবার মাইকিং করে সতর্ক করানো হলেও তেমন কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো দিকে মাইকিং করার পর শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন আরও বেড়ে গেছে বলে নৌশ্রমিকরা দাবি করছেন।

নৌশ্রমিকদের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি প্রতিকারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর ফাজিলপুর নৌকা ঘাট টোল ট্যাক্স এবং একই স্থানে পাঠানপাড়া খাস কালেকশনের নামে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের বিরুদ্ধে গত ৩০ মার্চ অভিযোগ দায়ের করা হয়, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য জনাব কামরুজ্জামান কামরুল গণমাধ্যমকে এই বিষয়ে জানান, "প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের চাঁদাবাজি সম্ভব নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।" তার মতে, প্রশাসন কোনো না কোনোভাবে এটির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এই অনিয়মের কারণে নৌযান শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দ্রুত সমাধান না হলে যে কোনো সময় নৌ-ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হতে পারে, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাথর ও বালু পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

নৌশ্রমিক নেতা বলেছেন, "এই চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা নৌ-ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হবো। তখন দেশের পাথর ও বালু পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে।"

প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, "একই ঘাটে দ্বৈত টোল, রশিদবিহীন আদায় এবং নৌকা আটকে চাঁদা আদায়—সব মিলিয়ে জাদুকাটা এখন 'ওপেন সিক্রেট' চাঁদাবাজির করিডোর। সুসংগঠিত এই চাঁদাবাজি শুধু অনৈতিকই নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার পরিপন্থী। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এটি শুধু শ্রমিক অসন্তোষ নয়, বরং একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা সংকটে রূপ নিতে পারে।"

Advertisement

Link copied!