কক্সবাজারের রামু উপজেলার রাজারকুল রেঞ্জ, যে বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই জায়গাটিই এখন পরিণত হয়েছে অভিযোগ, অনিয়ম আর দুর্নীতির অভয়ারণ্যে। সবুজ পাহাড় আর সংরক্ষিত বন আজ যেন দখল, বাণিজ্য আর ভয়ভীতির এক অদৃশ্য সাম্রাজ্যে বন্দী।
অভিযোগের তীর সরাসরি রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমানের দিকে, যিনি এসিএফ পদ থেকে ইন্টার্নশিপে এসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক গুরুতর অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন। যেখানে বন রক্ষায় আদর্শ ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে উল্টো কোটি টাকার চাঁদাবাজি, জমি বাণিজ্য, অভিযানের নামে কাটবাহী গাড়ি আটক করে কালক্ষেপণ করে পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া সহ ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তার নাম এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
স্থানীয়দের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অপারেশন। রাজারকুল রেঞ্জের তিন বিট কর্মকর্তা, আলফুয়াদ, শিহাব ও পল্লব কুমার এই চক্রের মূল কার্যকরী সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত। তাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এমন এক নেটওয়ার্ক, যেখানে আইনকেই ব্যবহার করা হচ্ছে ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বনের জমিতে ঘর নির্মাণ বা জমি ক্রয়-বিক্রির প্রতিটি ধাপেই রেঞ্জ কর্মকর্তার অনুমতি বাধ্যতামূলক। আর এই প্রশাসনিক ক্ষমতাকেই চাঁদাবাজির লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আপার রেজু বিট এলাকায় কালুর দোকান পূর্বপাড়ার একটি ঘটনা যেন পুরো চিত্রটিকে স্পষ্ট করে। রাসেল নামের এক ব্যক্তির কেনা জমিতে পাহাড় কাটার মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় ৭০ হাজার টাকা, যেখানে সরাসরি তদারকিতে ছিলেন বিট কর্মকর্তা আলফুয়াদ।
একই কৌশল, ভিন্ন স্থান। থোয়াইংগা কাটা এলাকার ফজল আম্বিয়া স্কুলের পেছনে জমি বিক্রির পর ঘর নির্মাণ শেষ হতেই হানা, তারপর অভিযান নামের নাটক, আর শেষে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে রফা।
জুম্মাপাড়া এলাকায়ও চলছে একই চিত্রনাট্য। আবুল হোসেনকে একটি দোকান নির্মাণ করতে গিয়ে দিতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। শুধু তিনি নন, মোজাফফর মিস্ত্রি, আলম ড্রাইভারসহ অনেকেই একই অভিযোগ তুলেছেন।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি আর শুধু ঘুষ নয়, এটি এক ধরনের সংগঠিত ভয়ভীতি নির্ভর অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া। মামলা, উচ্ছেদ, গ্রেপ্তারের হুমকি, এসব যেন এখন নিয়মিত অস্ত্র। ফলে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর ক্ষোভ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, এই অর্থের শেষ গন্তব্য। স্থানীয়দের দাবি, বিট পর্যায়ে আদায় করা অর্থ শেষ পর্যন্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমানের হাতেই পৌঁছে।
তবে প্রশ্ন উঠতেই রেঞ্জ কর্মকর্তার জবাব, সবই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জানা। এই এক বাক্যই যেন নতুন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জনমনে। তাহলে কি এই দুর্নীতির শিকড় আরও গভীরে? উপরের স্তর পর্যন্ত কি এর বিস্তার?
এদিকে, একের পর এক অভিযোগ উঠলেও কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। এই নীরবতা কি প্রশাসনিক উদাসীনতা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো সমীকরণ?
আপনার মতামত লিখুন :