যশোরের কেশবপুরে ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে, যা কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। কিন্তু ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং উচ্চ শ্রমিক মজুরির কারণে কৃষকরা অস্বস্তিতে রয়েছেন। ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত তাদের স্বস্তি মিলছে না। দুই মন ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি উঠছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) কেশবপুরে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা দরে শ্রমিক মজুরি বিক্রি হয়েছে। এই চড়া মূল্য সত্ত্বেও অনেক কৃষক শ্রমিক খুঁজে পাচ্ছেন না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কেশবপুর উপজেলায় ১৩ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর। গত বছর ১৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদ করেছিলেন কৃষকরা। সরকারের পক্ষ থেকে ৪ হাজার কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছিল।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকরা ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এক সময় এ এলাকার কৃষকদের ঘরে ঘরে গরু, জোয়াল ও লাঙ্গলসহ কৃষি যন্ত্রপাতি ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে ইঞ্জিন চালিত পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যবহার বেড়েছে।
প্রতাপপুর গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, ৬-৮ সদস্যের পরিবারের সারা বছরের যোগান দিতে হয় জমি চাষাবাদ করে। কিন্তু ইরি-বোরো চাষ ছাড়া অন্য ফসল তেমন না হওয়ায় হালের গরু পালন করা হয় না। আগে তারও হালের বলদ ছিল, কিন্তু সারা বছর গরু পালনে যে খরচ হয়, তা এখন আর কৃষকদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এখন বিচালীসহ গো-খাদ্যের অনেক দাম। গরু না থাকায় সকালে নিজেরাই ক্ষেতে মই টানছেন।
হাবিবুর রহমানের ছেলে আব্দুল মাজিদ বলেন, বাগদহা বিলে ৬ বিঘা জমিতে চলতি বোরো মৌসুমে ধান চাষ করবেন তারা। সকল জমিতেই গরুর বদলে নিজেদেরই মই টানতে হবে। মই টানতে সহযোগিতা করতে আসা কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, গরুর বদলে মই টানতে তিনজন মানুষের প্রয়োজন। তাই প্রতিবেশী হিসেবে তিনি সাহায্য করতে এসেছেন।
বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, তিনি ৩ বিঘা জমিতে ধান চাষ করবেন। কিন্তু এলাকায় হালের বলদ না পাওয়ায় নিজেদেরই ক্ষেতে মই দিতে হচ্ছে। ফতেপুর গ্রামের কৃষক হাবিবুল্লাহ জানান, সময়ের সাথে আধুনিকতার ছোঁয়া এখন গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে গেছে। এখন ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রযুক্তির পাশাপাশি জমি দ্রুত তৈরিতে গরু টানা লাঙ্গল ও মইয়ের পরিবর্তে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারে গরু টানা লাঙ্গল ও মই এখন কেশবপুরে তেমন একটা চোখে পড়ে না। কেশবপুর থেকে হালের বলদ প্রায় বিলুপ্তির পথে। সে কারণে তিনি নিজে ও ভাইদের সহযোগিতায় চলতি বোরো মৌসুমে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করা ৭ বিঘা জমির উঁচু-নিচু অংশসহ চাকার দাগ সমান করতে গরুর পরিবর্তে মই টানছেন।
গ্রাম বাংলার কৃষকদের গরু দিয়ে টানা হাল, মইয়ে জমি তৈরিতে সময় লাগতো। আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারে দ্রুত কাজ হচ্ছে। তবে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করা জমির উঁচু-নিচু অংশ বা চাকার দাগ সমান করতে এখনো মানুষই মই টানছে। মইয়ে হালকা কিছু ওজন দিয়ে তা দুজন বা একজন টেনে জমির প্রয়োজনীয় অংশ দ্রুত সমান করে ফেলছেন।
এলাকার কৃষকরা জানান, পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করা জমিতে চাকার দাগ থাকায় তা সমান করতে তারা নিজেরা মই টেনেছেন। আবুল হোসেন বলেন, তার ৩ বিঘা জমিতে বোরো ধান চারা রোপণের জন্য পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করার পর নিজেরাই মই টেনে জমি সমান করে চারা রোপণ করেছেন।
ব্রহ্মকাটি গ্রামের কৃষক জামাল সরদার, হামিদ সরদার, আনিছুর সরদার, রামচন্দ্রপুর গ্রামের ময়েজউদ্দিন, আব্দুল সরদার, সুজাপুর গ্রামের আতিয়ার রহমান, বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের সুজনসহ আরো অনেক কৃষক জানান, আধুনিক যন্ত্র দিয়ে দ্রুত জমি চাষ হওয়ায় এখন গরুর লাঙ্গল, মই হারিয়ে যাচ্ছে। গরুর বদলে বিকল্প হিসেবে মানুষই মই টেনে জমি সমান করে নিচ্ছে। এমন দৃশ্য উপজেলার প্রায় সব জায়গায়। তারা আরো বলেন, এই উপজেলা জুড়ে কৃষকরা ইরি-বোরো রোপণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ও প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মামুদা আক্তার বলেন, এবার কেশবপুর উপজেলায় ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো বীজতলা তৈরির পর পুরোদমে ইরি-বোরো রোপণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কৃষকরা। এবার এ উপজেলায় ১৩ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদ করছেন কৃষকরা।
আপনার মতামত লিখুন :