একসময় যেখানে গর্ভপাত ও মাতৃত্বকালীন সেবা পাওয়া ছিল দুঃস্বপ্ন, সেখানে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ নিয়েছে। আর সেই ভরসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এখানে চিকিৎসাসেবার মান প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিনের সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারে বদলে গেছে এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
গ্রামীণ জনপদে উন্নত সেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এখন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র কেন্দ্র এটি। কমপ্লেক্সটির সার্বিক অবকাঠামোর সৌন্দর্য বৃদ্ধি, নিয়ম-শৃঙ্খলার উন্নতি ও সেবার মানের ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিনের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়েও রোগীরা এখন আন্তরিকতাপূর্ণ সেবা পাচ্ছেন। বর্তমানে হাসপাতালের সেবা নিয়ে এলাকার মানুষ বেশ সন্তুষ্ট। ডা. শাহীনের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরলস পরিশ্রম, হাসপাতাল স্টাফদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন এবং দালালমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার ফলে বদলে গেছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র।
ডা. মো. শাহিন বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকে দৃশ্যমান নজির স্থাপন করেছেন। তার নেতৃত্বে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অবিশ্বাস্যভাবে বদলে গেছে। এটি এখন শুধু পরিচ্ছন্নই নয়, সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় খুলনা বিভাগে প্রথম এবং দেশের সেরাদের কাতারে স্থান করে নিয়েছে। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে জরুরি, সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা আগের চেয়ে অনেক উন্নত এবং রোগী বান্ধব হয়েছে। এই সুফল পাচ্ছে মোংলা উপজেলার সাধারণ মানুষ। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি ইতোমধ্যেই স্থানীয় এলাকাবাসীর আস্থার ঠিকানা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে উপজেলায় একটি মডেল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তৈরিতে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ডা. মো. শাহিন।
২০২২ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ডা. মো. শাহীন যোগদানের পর তার নেতৃত্বে দ্রুততম সময়ে বদলে যাওয়া মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: স্বাস্থ্যসেবা ও রোগী ব্যবস্থাপনায় খুলনা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার; সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো ডায়াগনস্টিক ও বিশেষজ্ঞ সেবা (স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসা); হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ও বাহিরের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক করা; চিকিৎসকদের সঠিক সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা; রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মিত সরবরাহ (সহজলভ্য) করা; অন্তঃবিভাগে প্রতি মাসে ৩০-৩৫টি সিজারসহ, হার্নিয়া, অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন হচ্ছে; প্রতি মাসে ৪০-৪৫টি নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে; সপ্তাহে ৩ দিন আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা হচ্ছে, এতে মাসে ২৫০টিরও অধিক আল্ট্রাসনোগ্রাম হচ্ছে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
জানা যায়, ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২ জন চিকিৎসক ও ২৭ জন সেবিকা নিয়ে রোগীদের নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে উপজেলায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রতিদিন প্রায় ৫০০-৬০০ জন রোগী সেবা নিয়ে থাকেন। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে প্রায় ২০০-৩০০ জন রোগী সেবা নিয়ে থাকে। এছাড়াও জরুরি প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করে ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ সেবা দেওয়া হয়। নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে সিসি ক্যামেরা দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ডা. মো. শাহিন ২০২২ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এই হাসপাতালে যোগদান করার পর চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি হাসপাতালকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় হাসপাতালের চারপাশ হয়ে উঠে সবুজের সমারোহ। ২০২৩ সালের জুন মাসে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি মেরামত সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম সিজারিয়ান অপারেশন শুরু হয়। যা বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় সাড়া ফেলেছে। যেখানে প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২টি সিজারিয়ান অপারেশন হয়ে থাকে। সাধারণ রোগীর একমাত্র ঠিকানা এখন মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। পাশাপাশি এখানে বিশেষায়িত ডেলিভারী কর্নার রয়েছে।
প্রয়োজনীয় জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও এখানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে সমন্বয় করে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নানা সংকট মোকাবেলার মাধ্যমে মোংলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ, আন্তঃবিভাগ এবং বহির্বিভাগের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম এবং সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক কার্যক্রম তদারকির মাধ্যমে মোংলায় স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অর্জন এবং এক অনন্য সুন্দর সফলতা বলে আখ্যা দিচ্ছেন স্থানীয়রা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী জানান, এই হাসপাতাল আর আগের মত নাই। ডাক্তার শাহিন আসার পর থেকে বদলেছে সব চিত্র। আমরা চিকিৎসাও পাচ্ছি আগের থেকে বেশি আন্তরিকতার সাথে। মো. জুয়েল নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দৃশ্যপট একেবারে পাল্টে দিয়েছেন বর্তমান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিন। তিনি এখানে যোগদানের পর থেকে হাসপাতালে রোগীদের খাবার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ফুল-ফলাদির বাগান ও অফিস স্টাফ ও রোগী এবং স্বজনদের অবসর সময় কাটানোর দর্শনীয় স্থান সৃজনের মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়নসহ নানামুখী সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাছাড়া রাত অবধি এই কর্মকর্তাকে হাসপাতালে কর্মব্যস্ত সময় পার করতেও দেখা গেছে।
হাসপাতালের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বলছেন, শাহিন স্যার খুব ভালো মনের ও রুচিশীল একজন মানুষ। তিনি আমাদের সকলকে সাথে নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করছেন হাসপাতালের উন্নয়নের জন্য। এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের কর্মকর্তার সৃজনশীল ভাবনা এবং উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। লেখক আফরোজা হীরা বলেন, ডা. শাহিনের সার্বিক প্রচেষ্টায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিনামূল্যে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের কারণে সরকারি এই হাসপাতাল সম্পর্কে মানুষের আস্থা বেড়েছে। এখানে চিকিৎসা নিতে এসে এখন আর কেউ ফিরে যায় না। মেডিকেল অফিসাররা অতি যত্নসহকারে রোগীদের কথা শোনেন এবং চিকিৎসাপত্র দেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত। আগের থেকে ডাক্তারের সংখ্যা বেশি থাকা এবং চিকিৎসার মান উন্নত হওয়ায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীদের প্রয়োজনে যেকোনো সময় ডাক্তাররা সেবা দিতে প্রস্তুত। এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এলাকাবাসীরও সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। তিনি আরও বলেন, আমি এই হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করি। প্রথমে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ তৈরি, অচল ও অর্ধসচল যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিশ্চিত করা ও মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করি। সকল চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বিক সহযোগিতায় এই সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। আমরা আগামীতেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে চাই।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২৩ মে ৩১ শয্যার এই হাসপাতালটি চালু হয়। এরপর ২০০৭ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয় সরকারি এই হাসপাতাল। হাসপাতাল চালুর পর ২০২৩ সালের ১লা জুন বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীনের তত্ত্বাবধানে অপারেশন থিয়েটারটি চালু হয়। এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহের সোমবার নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের অপারেশন সেবা চালু রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :