পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী পূবাইল বাজার পশুর হাটকে ঘিরে নতুন করে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১৭ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এ পশুর হাটের ঠিক বিপরীত পাশে নতুন কোরবানির পশুর হাট বসানোর নেপথ্যে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, ইজারাদার ও এলাকাবাসী। যারা ৫৪ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে দিতে চাইছে।
আর সেই সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই সদ্য বাড়িয়া ইউনিয়নে যোগ দেওয়া তহসিলদার আবদুল হাই সিকদার নিয়মবহির্ভূত ও ‘মিথ্যা তথ্যসম্বলিত’ প্রতিবেদন দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ছোট কয়ের নতুন পশুর হাটের প্রধান উদ্দোক্তা নূরুল আমিন জানান, এখানে আমাদের গ্রুপের মতামতের ভিত্তিতে কাজটা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। অপেক্ষায় আছি কয়েরে হাট পাইতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পূবাইল বাজার-ছোটকয়ের ব্রিজের ঠিক ওপারে মাত্র ৫০ মিটার দূরের জঙ্গলঘেরা এলাকায় শাক-সবজির টালের নিচে নতুন পশুর হাট বসানোর গোপন প্রস্তুতি চলছে।
অথচ সরকারি প্রতিবেদনে স্থানটির দূরত্ব ও বাস্তব চিত্র ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, এই ‘বিতর্কিত প্রতিবেদন’কে ভিত্তি করেই নতুন হাট অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনায় পূবাইল, ছোটকয়ের, বড়কয়েরসহ আশপাশের পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ী, ইজারাদার, স্থানীয় বাসিন্দা এমনকি বিএনপির স্থানীয় নেতারাও প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, “ঐতিহ্যবাহী পূবাইল বাজারকে ধ্বংস করে কোটি টাকার নতুন বাণিজ্য গড়ে তুলতেই প্রশাসনের ভেতরের একটি অসাধু চক্র মাঠে নেমেছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এত কাছাকাছি আরেকটি পশুর হাট বসানো হলে ভয়াবহ যানজট, সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তারা অভিযোগ করেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে গোপনে একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
এ বিষয়ে গাজীপুর সদর ভূমি কর্মকর্তা মঈন খান এলিস বলেন, “১০০ মিটার দূরত্বে আরেকটি হাট হলে আইনগত সমস্যা কোথায়? দু’টি হাট হলে সরকারের রাজস্বই বাড়বে।” এপার-ওপার দ্বন্দ্ব সম্পর্কে কিছু জানা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। পরে তিনি বাড়িয়া ইউনিয়নের তহসিলদার আবদুল হাই সিকদারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে বাড়িয়া ইউনিয়নের তহসিলদার আবদুল হাই সিকদার অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, “তদন্ত কী দিয়েছি, সেটা অ্যাসিল্যান্ডের কাছ থেকে জেনে নেবেন।” তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি দুদককে বলেছি, যে সাংবাদিক ১০০ কোটি টাকা লিখেছে, সেই সম্পত্তি তাকে বুঝিয়ে দিতে।” পরে “চায়ের দাওয়াত রইল” বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
এদিকে জয়দেবপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “আমাদের হাই অথরিটি জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়ার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এখনো ওই হাট কাউকে দেওয়া হয়নি।” তবে ৫৪ বছরের পুরোনো হাটের ধারাবাহিকতা ভেঙে মাত্র ২০০ মিটার দূরে নতুন হাট বসানোর উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়গুলো আমার জানা নেই।”
পুরো ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে ‘মসজিদের নামে পশুর হাট বাণিজ্যের’ অভিযোগও। স্থানীয়দের দাবি, গত ১৭ বছর ধরে দুটি মসজিদের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়ের এলাকার নূরুল আমিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওই চক্র ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করলেও বাস্তবে মসজিদের উন্নয়নে অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়নি।
পূবাইল বাজার জামে মসজিদের সিনিয়র সভাপতি আবদুল করিম মিয়া বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরেও সঠিক কোনো হিসাব পাইনি। ছোটকয়েরের নূরুল আমিনের নামেই পশুর হাট ইজারা হতো।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, “মসজিদের নাম ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি বছরের পর বছর নিজেদের পকেট ভারী করেছে। এবার আবার নতুন হাট বসানোর নামে একই নাটক শুরু হয়েছে।”
ঐতিহ্যবাহী পূবাইল বাজারকে ঘিরে প্রশাসনিক বিতর্ক, নতুন হাটের গোপন প্রস্তুতি, মিথ্যা প্রতিবেদনের অভিযোগ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বাণিজ্যের অভিযোগে পুরো এলাকা এখন থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :