গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক রাতেই নিভে গেল একটি পরিবারের ৫টি প্রাণ। ঘুমন্ত স্ত্রী, তিন নিষ্পাপ কন্যা সন্তান ও শ্যালককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার পর পালিয়ে গিয়ে পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
গাজীপুরে আলোচিত এই ৫ খুনের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মরদেহটি প্রধান অভিযুক্ত মোঃ ফোরকান মিয়ার (৪০) বলে ইতোমধ্যে শনাক্ত করেছেন স্বজনরা।
হৃদয়বিদারক এ হত্যাকাণ্ডে এখনও শোক ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি কাপাসিয়াবাসী। সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তিন শিশুকন্যার নির্মম মৃত্যু।
স্থানীয়দের ভাষায়, “একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানদের এভাবে হত্যা করতে পারে,এটা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জ জেলার গোপীনাথপুর এলাকার বাসিন্দা ফোরকান মোয়া স্ত্রী শারমিন (৩৫), তিন কন্যা সন্তান ও শ্যালক রাসেল মিয়াকে নিয়ে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক অশান্তি চলছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
গত ৮ মে গভীর রাত থেকে ৯ মে ভোরের মধ্যে কোনো এক সময় ঘুমন্ত অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। ধারালো চাপাতির আঘাতে একে একে প্রাণ হারান স্ত্রী, তিন কন্যা ও শ্যালক। পরদিন সকালে কাপাসিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পাঁচজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করলে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। মুহূর্তেই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
এরপরই রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে গাজীপুর জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর তদন্ত, মোবাইল ট্র্যাকিং ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে উঠে আসে ভয়াবহ সব তথ্য। তদন্তে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান ছিল পদ্মা সেতু এলাকায়।
পরে সেতুর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত এক ব্যক্তি সেতুর মাঝামাঝি অংশে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর নদীতে ঝাঁপ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে বিভিন্ন থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হলে পদ্মা নদী এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া এক অজ্ঞাত মরদেহের সঙ্গে ফোরকানের পরিচয়ের মিল পাওয়া যায়। পরে স্বজনরা মরদেহ শনাক্ত করলে পুলিশের সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও পরিকল্পিত। অভিযুক্তের মৃত্যুর পরও তদন্ত থেমে নেই। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ, মানসিক অবস্থা কিংবা সহযোগীর সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না,সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এদিকে কাপাসিয়ার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এলাকায়। শিশুদের রক্তাক্ত দেহের স্মৃতি ভুলতে পারছেন না প্রতিবেশীরা। অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছেন, “এক রাতেই শেষ হয়ে গেল একটা সংসার, নিভে গেল ৫ টি জীবন।”
গাজীপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং মামলার প্রতিটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :