গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী পূবাইল বাজার পশুর হাটকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এবার অভিযোগ উঠেছে,পূবাইল বাজারের বৈধ ও দীর্ঘদিনের পশুর হাটকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে “মিথ্যা প্রতিবেদন” তৈরি করা হয়েছে। আর সেই প্রতিবেদনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সদ্য সংযুক্ত বিতর্কিত তহসিলদার আবদুল হাই শিকদারের নাম।
স্থানীয়দের দাবি, কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগে আলোচিত এই ভূমি কর্মকর্তা একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছেন। উদ্দেশ্য একটাই,পূবাইল বাজারের ইজারা হাতছাড়া হওয়ায় ছোট কয়ের ব্রীজের গোড়ায় বিকল্প পশুর হাট বসানোর পথ তৈরি করা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে নূরুল আমিন গং। যিনি পূবাইল আদর্শ কলেজের অফিস কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। আওয়ামী দোসরদের সাথে সখ্যতা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, দুই বছর আগেও পূবাইল বাজার পশুর হাট ইজারা না পেয়ে একই স্থানে “মসজিদের উন্নয়নের” কথা বলে পশুর হাট বসানো হয়েছিল পূবাইল - ছোট কয়ের ব্রীজের গোড়ায়। করেছিল এই সিন্ডিকেট। তখন এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক জটিলতায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়, তেমন সফল হতে পারেনি। এবার নতুন কৌশলে আবারও মাঠে নেমেছে নূরুল আমিন চক্রটি।
সিন্ডিকেট প্রধান নূরুল আমিন জানান, আমি নিজ থেকে কিছুই করিনা। আমাকে আমাদের কিছু লোক সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব দেয় আমি শুধু তাদের কথা মত কাজ করি।
বিতর্কিত কর্মকর্তাকে এনে কেন তৈরি হলো প্রতিবেদন? এলাকাবাসীর প্রশ্ন—গাজীপুর সদর সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মঈন খান এলিস ও জয়দেবপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজ্জাদ হোসেন কেন হঠাৎ করে বিতর্কিত কর্মকর্তা আবদুল হাই শিকদারকে বাড়িয়া ভূমি অফিসে এনে পূবাইল বাজার হাটসংক্রান্ত বিষয়ে মতামত দিতে বললেন?
আবার কেনই বা শিকদার এসিল্যাণ্ড অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন? আবার এসিল্যাণ্ড মঈন খান এলিস তহসিলদার আবদুল হাই শিকদারের সঙ্গে পরামর্শ করতে বললেন? স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরো বিষয়টিই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। কারণ পূবাইল বাজারের বর্তমান পশুর হাট থেকে প্রস্তাবিত ছোট কয়ের হাটের দূরত্ব নিয়ে প্রশাসনিকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একদিকে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মঈন খান এলিস দাবি করেন, “ প্রতিবেদনে দেয়া দুই কিলোমিটার দূরত্ব না হয়ে ১০০ মিটার হলেও কয়ের ব্রীজের গোড়ায় হাট হলে আইনগত সমস্যা নেই।”
অন্যদিকে পূবাইল ভূমি অফিসের তহসিলদার আরিফ উল্লাহ বলেন, “পূবাইল বাজার হাট সরকারি জমিতে হয় ও প্রস্তাবিত নতুন হাট ৫০ থেকে ১০০ মিটারের বেশি দূরে হবে কিনা সন্দেহ আছে।” আর আমাদের জমিতে হাট বসাতে হলে ডিসির অনুমোদন লাগে।
দুই কর্মকর্তার বক্তব্যের এই বড় ধরনের অসামঞ্জস্য এখন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দূরত্ব কম হওয়ায় আইনগত জটিলতা এড়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে কী?
ইউএনও’র বক্তব্যে নতুন মোড়------
এ বিষয়ে জয়দেবপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)মো.সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “পশুর হাট সংক্রান্ত বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিবেদন ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আইনবহির্ভূত কোনো কিছুই অনুমোদন পাবে না।”
ইউএনও’র এই বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তথাকথিত “মিথ্যা প্রতিবেদন” ইস্যু। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যদি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে কার স্বার্থে তড়িঘড়ি করে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন তৈরি করা হলো?
ইউনিয়ন ভূমি সহকারী থেকে শত কোটি টাকার মালিক! --------
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে আবদুল হাই শিকদারের বিতর্কিত সম্পদের তথ্য। ১৯৮৯ সালে ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা বর্তমানে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী পদে কর্মরত। কিন্তু কয়েক দশকের চাকরিজীবনে তিনি ও তার পরিবারের নামে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়।
অভিযোগ রয়েছে—খারিজ, নামজারি, খাজনা, পর্চা ও জমিসংক্রান্ত ফাইল জিম্মি করে ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। শুধু নিজের নামে নয়, স্ত্রী শিরিন সুলতানার নামেও রয়েছে আলিশান বাড়ি, মার্কেট ও একাধিক বাণিজ্যিক স্থাপনা।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উত্তর বিলাসপুর সড়কের ভাঙা মসজিদসংলগ্ন এলাকায় রয়েছে প্রায় ৮ কাঠা জমির ওপর নির্মিত পাঁচতলা দৃষ্টিনন্দন ভবন।
নিজ গ্রাম নলগাঁও নতুনবাজারে রয়েছে তিনতলা মার্কেট, পৃথক আরও মার্কেট ও একাধিক প্লট। এলাকাবাসীর দাবি—তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গণমাধ্যমে এই খবর ইতোমধ্যে উঠে এসেছে। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, “একজন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কীভাবে এত অল্প সময়ে এত টাকার মালিক হন?”তাদের দাবি, দুদকে চলমান অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে ভয়াবহ বাস্তবতা।
পূবাইল বাজার হাটকে ঘিরে কার স্বার্থ?------
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইজারাসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ,এবার পূবাইল বাজার পশুর হাটের ইজারা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেট এখন ছোট কয়ের ব্রীজের গোড়ায় বিকল্প পশুর হাট বসানোর জন্য প্রশাসনিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে।
এলাকাবাসীর মতে, “মসজিদের উন্নয়ন”, “জনস্বার্থ” কিংবা “বিকল্প হাট”—এসব কেবল বাহানা। প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে লাখ লাখ টাকার পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
তারা বলছেন, যদি প্রস্তাবিত হাট অনুমোদন পায়, তাহলে পূবাইল বাজারের ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি একই এলাকায় একাধিক হাটের কারণে যানজট, আইনশৃঙ্খলা অবনতি ও সংঘর্ষের আশঙ্কাও বাড়বে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পূবাইল-কয়েরবাসী--
এদিকে পুরো ঘটনায় এখন সবার নজর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার দিকে।স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন যদি প্রকৃত দূরত্ব, সরকারি নীতিমালা ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তাহলে “মিথ্যা প্রতিবেদন” তৈরির নেপথ্যের রহস্য বেরিয়ে আসবে।
সর্বোপরি পূবাইল ও কয়ের এলাকার মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, বিতর্কিত সিন্ডিকেট আবারও “মসজিদের নামে” নতুন পশুর হাট বসিয়ে লাখ লাখ টাকার নিয়ন্ত্রণ নেবে? নাকী সরকারি পশুর হাট পূবাইল বাজার তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী মনে করছেন, পূবাইল বাজার পশুর হাটের বিকল্প অতীতেও ছিলনা, ভবিষ্যতেও থাকবেনা । মাঝখানে শুধু জঙ্গলে মঙ্গল খুঁজা ও সিন্ডিকেট করে মসজিদের নামে পকেট ভারীর পাঁয়তারা।
আপনার মতামত লিখুন :