৫৮ কোটির কালিয়াকৈর হাইটেক রেলস্টেশন এখন মাদক ও অপরাধের আখড়া

তুষার আহম্মেদ , কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

প্রায় ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক রেলওয়ে স্টেশনটি এখন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। 

আধুনিক নির্মাণশৈলী, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও যাত্রীসেবায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এই রেলস্টেশন। প্রতিদিন এই রেলপথ দিয়ে ৩২টি ট্রেন চলাচল করলেও স্টেশনটিতে থামে মাত্র একটি ট্রেন। তাও শুধুমাত্র ঢাকাগামী পথে। উত্তরবঙ্গমুখী ফেরার পথে সেই ট্রেনটিরও কোনো যাত্রাবিরতি নেই। ফলে বিশাল পরিসরের আধুনিক এই স্টেশনটি এখন অনেকটাই জনশূন্য। যাত্রী না থাকায় এটি মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে স্টেশনের বিভিন্ন মালামাল চুরি হচ্ছে। আতঙ্কে রয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, পানি ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে।

রেলস্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাত্রী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী-জয়দেবপুর রেললাইনের কালিয়াকৈর উপজেলার গোয়ালবাথান এলাকায় বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কের পাশে বিপুল ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় এই দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত স্টেশনটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল গাজীপুর শিল্পাঞ্চল, বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে যাতায়াতকারী বিপুল সংখ্যক যাত্রীর সুবিধার কথা মাথায় রেখে। ধারণা করা হয়েছিল, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করবেন। সে লক্ষ্য সামনে রেখে স্টেশনটিতে নির্মাণ করা হয় আধুনিক প্ল্যাটফর্ম, লুপলাইন, উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা, টিকিট কাউন্টার, ভিআইপি বিশ্রামাগারসহ নানা আধুনিক সুবিধা। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের আদলে নির্মিত এই স্টেশনটি ২০১৮ সালে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর কিছুদিন একটি ডেমো ট্রেন চলাচল করলেও করোনাকাল থেকে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে স্থানীয়দের আন্দোলন, মানববন্ধন ও বিক্ষোভের মুখে টাঙ্গাইল কমিউটার ও সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু করা হয়েছিল। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর নানা কারণে সেই ট্রেনগুলোর স্টপেজও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে শুধু সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকার দিকে যাওয়ার সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে স্টেশনটিতে থামে। তবে ফেরার পথে সেটিও আর থামে না।

অথচ এই রেলপথ দিয়ে প্রতিদিন রাজশাহীর সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেস, খুলনার চিত্রা এক্সপ্রেস, নীলফামারীর নীলসাগর এক্সপ্রেস, সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেন চলাচল করছে। 

স্থানীয়দের দাবি, এসব ট্রেনের অন্তত কয়েকটির যাত্রাবিরতি চালু করা হলে ঢাকা, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, সাভারসহ উত্তরবঙ্গের হাজারো যাত্রী কম খরচে ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন।

স্থানীয়রা জানান, ট্রেন না থামায় প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী স্টেশনে এসে ফিরে যাচ্ছেন। এতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একই সঙ্গে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে স্টেশনের উন্নত কাচের দেয়াল, রঙিন অবকাঠামো ও বিভিন্ন মূল্যবান স্থাপনা। বিশাল ব্যয়ে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন স্টেশনটি এখন যেন টিকটক ভিডিও ও বিনোদনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে কিছু শিক্ষার্থীও। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সন্ধ্যার পর পুরো স্টেশন এলাকা প্রায় শুনশান হয়ে পড়ে। ফলে চুরি, ছিনতাই ও মাদকের মতো অপরাধ বাড়ছে। স্টেশনে ১২ জন জনবল থাকলেও নেই কোনো নৈশপ্রহরী। ইতোমধ্যে স্টেশনের পানির পাম্পসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

কালিয়াকৈর হাইটেক সিটি রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার খাইরুল ইসলাম বলেন,“রাজশাহী-জয়দেবপুর রেললাইনে প্রতিদিন ৩২টি ট্রেন চলাচল করলেও আমাদের স্টেশনে মাত্র একটি ট্রেনের স্টপেজ রয়েছে। আগে ডেমো ট্রেন চললেও করোনাকালীন সময়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া আরও দুটি ট্রেন থামতো, সেগুলোও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নিরাপত্তার অভাবে এখানে মাদকসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তা না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন,“কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক রেলস্টেশনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্য প্রচুর যাত্রী রয়েছে। কিন্তু মাত্র একটি ট্রেন থামায় যাত্রীরা ফিরে যাচ্ছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে। স্টেশনে ট্রেনের যাত্রাবিরতি বাড়ানোর জন্য রেল বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই রেলস্টেশন যদি যাত্রীসেবাতেই কাজে না আসে, তবে এর প্রয়োজনীয়তা কোথায়? দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু করে স্টেশনটিকে সচল ও নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

Advertisement

Link copied!